Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ফিরে দেখা বিশ্বকাপ ১৯৫৪: ‘বার্নের অলৌকিক’ ম্যাচ এবং জার্মান সাম্রাজ্যের উদয়

 

ফিরে দেখা বিশ্বকাপ ১৯৫৪: ‘বার্নের অলৌকিক’ ম্যাচ এবং জার্মান সাম্রাজ্যের উদয়

ফিরে দেখা বিশ্বকাপ ১৯৫৪: ‘বার্নের অলৌকিক’ ম্যাচ এবং জার্মান সাম্রাজ্যের উদয়

স্পোর্টস ডেস্ক, পকেট নিউজ | ১৬ মে, ২০২৬

১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর ধূসর বিকেলে যে ফুটবল মহাযাত্রার সূচনা হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই দীর্ঘ পথচলায় কোথাও পেলের সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার জাদুকরি ছোঁয়া, কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্ব পাওয়ার গল্প রয়েছে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এর মধ্যে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং অবিশ্বাস্য এক অধ্যায় হিসেবে সামনে আসে ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপ। যা ফুটবল বিশ্বে পরিচিত ‘মিরাকল অব বার্ন’ বা ‘বার্নের অলৌকিক ঘটনা’ নামে।

জার্মানির রূপকথা ও পরাশক্তি হাঙ্গেরির পতন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনো টাটকা। যুদ্ধাপরাধের দায়ে ১৯৫০ বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ থাকা জার্মানি যখন ১৯৫৪ আসরে ফিরল, তখন তাদের কেউ গোনাতেই ধরেনি। অথচ সেই সাধারণ দলটিই ফাইনালে হারিয়ে দিল সে যুগের অবিসংবাদিত সেরা দল ফেরেঙ্ক পুসকাসের হাঙ্গেরিকে! প্রথম পর্বে যে হাঙ্গেরির কাছে ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল জার্মানি, সেই হাঙ্গেরির বিপক্ষে ফাইনালে ৩-২ ব্যবধানে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। এই জয় দিয়েই ফুটবল বিশ্বে শুরু হয় জার্মান সাম্রাজ্যের।

অদ্ভুত নিয়ম ও গোলের বন্যা

১৯৫৪ বিশ্বকাপের ফরম্যাট ছিল বেশ জগাখিচুড়ি। চার গ্রুপে ভাগ করা ১৬ দলের মধ্যে ৮টি বাছাই ও ৮টি অবাছাই দল ছিল। গ্রুপ পর্বে কোনো ম্যাচ ড্র হলে ৩০ মিনিট অতিরিক্ত খেলা হতো। আরও অদ্ভুত বিষয় ছিল, নকআউট পর্বে এক গ্রুপে রাখা হয়েছিল চার গ্রুপ চ্যাম্পিয়নকে এবং অন্য গ্রুপে চার রানার্সআপকে!

তবে এই বিশ্বকাপটি এখনো ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি গোল হওয়া আসর (ম্যাচপ্রতি গড় গোল ৫.৩৮টি)। কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রিয়া-সুইজারল্যান্ড ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের এক ম্যাচে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়ে, যার স্কোরলাইন ছিল ৭-৫!

মাথায় টিউমার নিয়েও খেললেন অধিনায়ক!

কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ঐতিহাসিক অস্ট্রিয়া-সুইজারল্যান্ড ম্যাচেই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। প্রতিপক্ষের কনুইয়ের আঘাতে জ্ঞান হারান সুইস অধিনায়ক রজার বোকে। পরে অসংলগ্ন কথা বলতে বলতেই পুরো ম্যাচ খেলেন তিনি। ম্যাচ শেষে চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানান, বোকের মাথায় টিউমার রয়েছে এবং অবিলম্বে অস্ত্রোপচার না হলে তিনি মারা যাবেন। অপারেশন সফল হলেও বোকে আর কখনো মাঠে নামতে পারেননি, তবে তিনি বেঁচে ছিলেন আরও ৪০ বছর।

ওভেনের উত্তাপে উলের জার্সি!

স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছিল এক চরম খামখেয়ালিপনার মধ্য দিয়ে। স্কটিশ ফেডারেশন ভেবেছিল সুইজারল্যান্ডে পাহাড় আছে মানেই সেখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা! ফলে তারা ফুটবলারদের জন্য নিয়ে আসে উলের তৈরি মোটা ও লম্বা হাতার জার্সি। কিন্তু সুইস গ্রীষ্মের প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উলের জার্সি পরে খেলতে নেমে মাঠে আক্ষরিক অর্থেই গলে গিয়েছিলেন স্কটিশরা। ফলস্বরূপ উরুগুয়ের কাছে ৭-০ গোলে বিধ্বস্ত হতে হয় তাদের।

এক বালকের আঙুলে তুরস্কের লটারি ভাগ্য

বাছাইপর্বে স্পেন ও তুরস্ক সমান পয়েন্টে শেষ করায় নিরপেক্ষ মাঠে তৃতীয় ম্যাচটি ২-২ গোলে সমতায় শেষ হয়। তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, বিজয়ী নির্ধারণের জন্য একটি হ্যাটে দুই দেশের নাম লিখে ফ্রাঙ্কো জেম্মা নামের এক বালককে লটারির কাগজ তুলতে ডাকা হয়। সেই বালক তুরস্কের নাম তোলায় অবিশ্বাস্য সৌভাগ্যে মূল পর্বে চলে যায় তুর্কিরা। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সেই বালককে মাসকট হিসেবে সুইজারল্যান্ডে নিয়ে গিয়েছিল তারা।

‘ব্যাটেল অব বার্ন’ বা বার্নের যুদ্ধ

২৭ জুন হাঙ্গেরি-ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালটি ফুটবলের চেয়ে মারামারির জন্য ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে। হাঙ্গেরি ৪-২ গোলে জিতলেও ম্যাচজুড়ে চলে হাতাহাতি। ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের মাওরো রাফায়েল বন্ধুত্বের হাত বাড়ালে হাঙ্গেরির জিবোর তাকে ঘুষি মারেন। এরপর খেলোয়াড়, কোচ ও স্টাফদের মধ্যে তুমুল মারামারি শুরু হয়। আহত পুসকাস বোতল ছুড়ে মারেন ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়ের মুখে, আর ব্রাজিলের কোচ বুট ছুড়ে মারেন হাঙ্গেরির কোচের কপালে। বিস্ময়করভাবে, এই ঘটনায় ফিফা কাউকেই শাস্তি দেয়নি।

জুতো-প্রযুক্তির জাদুতে বিশ্বজয়

ফাইনালের আগে টানা ৩১ ম্যাচ অপরাজিত থাকা হাঙ্গেরি ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত জার্মানির কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে যায়। আর এই জয়ের পেছনে অবদান ছিল জার্মান জুতোর কারিগর আডলফ ‘আডি’ ড্যাসলারের (অ্যাডিডাসের প্রতিষ্ঠাতা)।

খেলার মাঝে মুষলধারে বৃষ্টি নামলে মাঠ কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। আডি ড্যাসলারের তৈরি বিশেষ বুটের নিচের স্পাইকগুলো আবহাওয়া অনুযায়ী বদলে নেওয়া যেত। কোচের নির্দেশে জার্মান খেলোয়াড়েরা লম্বা স্পাইক লাগিয়ে মাঠে নামেন, অন্যদিকে হাঙ্গেরির খেলোয়াড়েরা ভেজা ঘাসে বারবার পিছলে পড়তে থাকেন। ৮৪ মিনিটে হাঙ্গেরির গোলকিপার পিছলে পড়লে জার্মানি জয়সূচক ৩য় গোলটি পায়।

এই বিশ্বজয়ের পর জার্মানিতে নেমে এসেছিল উৎসবের ঢল। মিউনিখের মেয়র সেদিন স্কুল, ব্যাংক, অফিস সব ছুটি ঘোষণা করেছিলেন এবং সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে বরণ করে নিয়েছিলেন তাঁদের নতুন বিশ্বজয়ী নায়কদের।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ