Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ফিরে দেখা ১৯৮৬ বিশ্বকাপ: ম্যারাডোনার একক জাদুতে বদলে যাওয়া বিশ্বকাপের গল্প

 

মেক্সিকো ’৮৬: ম্যারাডোনার একক জাদুতে বদলে যাওয়া বিশ্বকাপের গল

মেক্সিকো ’৮৬: ম্যারাডোনার একক জাদুতে বদলে যাওয়া বিশ্বকাপের গল

নিজস্ব প্রতিবেদক | পকেট নিউজ 

ফুটবল মূলত ১১ জনের দলীয় খেলা। কিন্তু ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে সেই প্রচলিত ধারণাকেই যেন একাই বদলে দিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি Diego Maradona। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে তিনি আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন। আজও সেই আসরকে অনেকেই বলেন—“ম্যারাডোনা ও বাকি ১০ জনের বিশ্বকাপ”।

একক আধিপত্যে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়

কোচ Carlos Bilardo–এর দলটি পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে অনেকাংশেই নির্ভর করেছিল ম্যারাডোনার সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব ও গোল করার সামর্থ্যের ওপর। অধিনায়ক হিসেবে মাঠে তিনি ছিলেন দলের মস্তিষ্ক, হৃদয় এবং আক্রমণের প্রধান চালিকাশক্তি।

বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তাঁর দুটি গোল ফুটবল ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। প্রথমটি বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’, আর দ্বিতীয়টি—যেখানে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একের পর এক ডিফেন্ডার কাটিয়ে গোল করেছিলেন—আজও “শতাব্দীর সেরা গোল” হিসেবে বিবেচিত হয়।

কলম্বিয়া সরে দাঁড়ানোয় আয়োজক হয় মেক্সিকো

১৯৮৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব প্রথমে পেয়েছিল Colombia। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে ১৯৮২ সালে দেশটি সরে দাঁড়ায়। পরে Mexico আয়োজক হওয়ার দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায়।

বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র আট মাস আগে ভয়াবহ ভূমিকম্পে মেক্সিকো সিটি বিধ্বস্ত হলেও অলৌকিকভাবে বিশ্বকাপের জন্য নির্ধারিত স্টেডিয়ামগুলো অক্ষত থাকে। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ীই আয়োজন সম্পন্ন হয়।

নতুন ফরম্যাট, নতুন নাটক

এই আসরেই প্রথমবার ২৪ দল নিয়ে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। ছয় গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুই দলের পাশাপাশি সেরা চারটি তৃতীয় স্থানধারী দলও নকআউটে ওঠার সুযোগ পায়। ফলে কোনো ম্যাচ না জিতেও দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার নজির তৈরি হয়।

তীব্র গরমের মধ্যেও টুর্নামেন্টে হয়েছিল কয়েকটি ক্লাসিক ম্যাচ। কোয়ার্টার ফাইনালে Brazil ও France–এর রোমাঞ্চকর লড়াই, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে বেলজিয়ামের ৪-৩ গোলের জয় কিংবা স্পেনের বড় ব্যবধানে জয়ের ম্যাচ দর্শকদের এখনও স্মরণীয় হয়ে আছে।

মেক্সিকোর স্বপ্নভঙ্গ ও কোকা-কোলার বিজ্ঞাপন

বিশ্বকাপের আগে মেক্সিকোর তারকা Hugo Sánchez–কে নিয়ে তৈরি কোকা-কোলার এক বিজ্ঞাপন বেশ জনপ্রিয় হয়। সেখানে তাঁকে পেনাল্টি থেকে গোল করতে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাওয়া পেনাল্টি তিনি মিস করেন। বিজ্ঞাপন আর বাস্তবতার এই বৈপরীত্য বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে।

স্কটল্যান্ডের অদ্ভুত ‘উৎসব’

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর স্কটল্যান্ড দলের খেলোয়াড়েরা হোটেলে ফিরে মদ্যপান করে এক অভিনব উদ্‌যাপনে মেতে ওঠেন। সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, তাঁরা দলগতভাবে নগ্ন হয়ে হোটেলের ভেতরে ঘোরাফেরা করেছিলেন, যা তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

বিলার্দোর কুসংস্কার

আর্জেন্টিনার কোচ কার্লোস বিলার্দো ছিলেন চরম কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ম্যাচের আগে নির্দিষ্ট কফিশপে যাওয়া, ম্যারাডোনার বাবার হাতে রান্না করা বারবিকিউ খাওয়া কিংবা বাসে নির্দিষ্ট গান বাজানো—এসব ছিল তাঁর বাধ্যতামূলক রুটিনের অংশ।

মজার বিষয় হলো, ফাইনালে West Germany–কে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পরও বিলার্দো ক্ষুব্ধ ছিলেন। কারণ, তাঁর দল দুটি গোল খেয়েছিল কর্নার থেকে হেডে—যা একজন কৌশলী কোচ হিসেবে তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না।

ফুটবল ইতিহাসে অনন্য এক বিশ্বকাপ

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের এক মহাকাব্যিক অধ্যায়। সেখানে ছিল রাজনৈতিক উত্তাপ, নাটকীয়তা, কুসংস্কার, বিতর্ক, অদ্ভুত ঘটনা এবং সর্বোপরি ম্যারাডোনার অলৌকিক ফুটবলশৈলী।

চার দশক পেরিয়ে গেলেও মেক্সিকোর রোদঝলমলে বিকেলগুলো এখনও ফুটবলপ্রেমীদের মনে অমলিন। কারণ, সেই বিশ্বকাপ দেখিয়েছিল—কখনো কখনো একজন মানুষও পুরো ফুটবল বিশ্বকে বদলে দিতে পারেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ