ঈদযাত্রার শেষ তিন দিনে বাড়ছে চাপ, ৯৪ স্পটকে ঘিরে যানজটের শঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন লাখো মানুষ। আগামী সোমবার থেকে বুধবার—এই তিন দিনকে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হবে দেশের সড়ক-মহাসড়কে। একদিকে ঢাকা ছাড়বে ঘরমুখো মানুষ, অন্যদিকে রাজধানীতে ঢুকবে কোরবানির পশুবাহী ট্রাক। ফলে ঈদযাত্রার শেষ সময়ে বড় ধরনের যানজট ও ভোগান্তির আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
হাইওয়ে পুলিশ ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে ৯৪টি যানজটপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার সড়কের অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও চলমান উন্নয়নকাজ, টোল প্লাজা, বাজার ও শিল্পাঞ্চল ঘিরে তৈরি হতে পারে দীর্ঘ যানজট।
প্রতিদিন ঢাকা ছাড়বেন প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষণা অনুযায়ী, ঈদের আগে তিন থেকে চার দিনে ঢাকা ছাড়েন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষ। ঈদুল আজহায় এই চাপ আরও বাড়ে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ রাজধানী ছাড়বেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও অন্যান্য পরিবহন মিলিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২২ লাখ মানুষের যাতায়াতের সক্ষমতা রয়েছে। অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে রাস্তায় নামছে ফিটনেসবিহীন বাস ও ট্রাক, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সবচেয়ে বেশি শঙ্কা তিন মহাসড়কে
হাইওয়ে পুলিশের তালিকায়:
ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কে ২৫টি
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ২৫টি
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২১টি
স্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঢাকা-উত্তরবঙ্গ পথে উদ্বেগ
গাজীপুরের চন্দ্রা উড়ালসড়কের পশ্চিম প্রান্তকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ধরা হচ্ছে। চার লেনের কাজ শেষের পথে হলেও কিছু উড়ালসড়ক ও পাতালসড়কের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। পাশাপাশি মহাসড়কের পাশের পোশাক কারখানা, বাজার ও বাসস্ট্যান্ডও যানজটের কারণ হতে পারে।
ঢাকা-সিলেট পথে উন্নয়নকাজের ভোগান্তি
আশুগঞ্জ গোলচত্বর ও বিশ্বরোড মোড় গত দুই ঈদের মতো এবারও দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলায় এসব এলাকায় খানাখন্দ ও সংকীর্ণ রাস্তার কারণে ধীরগতির যান চলাচল দেখা যাচ্ছে। নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলও ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে টোল প্লাজার চাপ
মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজায় ঈদের সময় দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। কুমিল্লার মাধাইয়া, চান্দিনা ও নিমসার বাজার এলাকাও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
রাজধানী থেকে বের হওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ
ঢাকা ছাড়ার প্রধান তিন পথ—গাবতলী, উত্তরা-আবদুল্লাহপুর ও মেয়র হানিফ উড়ালসড়ক—তিনটিতেই রয়েছে নানা সমস্যা।
মেয়র হানিফ উড়ালসড়কের টোল প্লাজায় দীর্ঘ সারির আশঙ্কা
বিমানবন্দর-গাজীপুর অংশে বিআরটি প্রকল্পের কারণে ধীরগতি
ঢাকা-আশুলিয়া উড়ালসড়ক নির্মাণকাজে বাড়তি চাপ
গাবতলী পশুর হাট ও হেমায়েতপুরে যত্রতত্র বাস থামানোয় জটের শঙ্কা
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-আরিচা ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কে এখনো অবাধে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। অনেক বাস মহাসড়কের মূল লেন আটকে যাত্রী ওঠানামা করছে, যা যান চলাচলে বড় বাধা তৈরি করছে।
বাড়তি পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার।
ঢাকা জেলা (উত্তর) ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক রুহুল আমিন সোহেল জানান, রোববার সকাল থেকে অতিরিক্ত ৬৫০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে।
এ ছাড়া ঈদের সাত দিন আগে থেকে ঈদের পর তিন দিন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক, টোল প্লাজা ও যানজটপ্রবণ এলাকায় দায়িত্ব পালন করবে বিজিবি। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায়ও সহায়তা করবে বাহিনীটি।
বিআরটিএর ১৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইতিমধ্যে মাঠে নেমেছেন। বাস টার্মিনালগুলোতেও চলছে তদারকি।
বৃষ্টি ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন বড় ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদের আগে ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কারণ, অনেক সড়কে এখনো উন্নয়নকাজ শেষ হয়নি। বৃষ্টির কারণে যানবাহনের গতি কমে গেলে দ্রুত দীর্ঘ যানজট তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া ঈদকে কেন্দ্র করে ফিটনেসবিহীন বাস ও ট্রাক সড়কে নামার প্রবণতাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে পশুবাহী ট্রাক ফিরতি পথে যাত্রী বহন করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
“এখনো ভোগান্তির আশঙ্কা আছে”
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহনবিশেষজ্ঞ মো. হাদীউজ্জামান বলেন,
“চার লেনের চওড়া সড়ক হয়েছে, কিন্তু সক্ষমতা ততটা বাড়েনি। ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। কোনো দুর্ঘটনা, বৃষ্টি বা অনিয়ম ঘটলে পুরো পরিস্থিতি ভেঙে পড়তে পারে।”
তিনি মনে করেন, শুধু অবকাঠামো নয়, সঠিক ব্যবস্থাপনাই এবার ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করার মূল চাবিকাঠি।
পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online

0 মন্তব্যসমূহ