লাখো কণ্ঠে ‘লাব্বাইক’, আরাফাতের ময়দানে আজ হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা
নিজস্ব প্রতিবেদক | পকেট নিউজ
পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা আজ। সৌদি আরবের স্থানীয় সময় ৯ জিলহজ মঙ্গলবার লাখো মুসল্লির কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে—“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।” বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা হজযাত্রীরা আজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও নাজাত কামনায় ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকবেন।
ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের অন্যতম হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন হলো আরাফাতের ময়দানে অবস্থান। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, ৯ জিলহজ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতে অবস্থান না করলে হজ পূর্ণ হয় না। তাই এই দিনটিকেই হজের প্রাণ বা মূল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গতকাল সোমবার থেকেই হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মক্কার পবিত্র কাবা শরিফসংলগ্ন মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের তাঁবুর নগরী মিনায় জড়ো হন লাখো হাজি। আজ ফজরের নামাজের পর তাঁরা মিনার ক্যাম্প থেকে রওনা হয়েছেন আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে।
১৪০০ বছর আগে এই আরাফাতের ময়দানেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতিবিজড়িত ময়দানে দাঁড়িয়ে হাজিরা আজ আল্লাহর দরবারে নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা চাইবেন। একই সঙ্গে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, দেশবাসী ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনায় দোয়া করবেন।
আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত মসজিদে নামিরা থেকে আজ হজের খুতবা প্রদান করা হবে। এবার খুতবা দেওয়ার কথা রয়েছে মসজিদে নববির প্রবীণ ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফির। খুতবা শেষে হাজিরা জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন এবং দিনভর জিকির, তিলাওয়াত ও দোয়ায় কাটাবেন।
হাদিস শরিফে আরাফাত দিবসের ফজিলত সম্পর্কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, “আরাফাহর দিনে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।” ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এই দিনটি মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি, আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুযোগ।
সূর্যাস্তের পর হাজিরা আরাফাত থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাতযাপন করবেন তাঁরা। ফজরের নামাজ শেষে শয়তানকে নিক্ষেপের জন্য পাথর সংগ্রহ করে ১০ জিলহজ আবার মিনায় ফিরবেন।
মিনায় পৌঁছে হাজিরা বড় জামারায় সাতটি পাথর নিক্ষেপ করবেন। এরপর পশু কোরবানি, মাথা মুন্ডন বা চুল ছাঁটা এবং ইহরামের কাপড় পরিবর্তনের মাধ্যমে হজের পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন। পরে মক্কায় গিয়ে কাবা শরিফ তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার মধ্যকার সাঈ সম্পন্ন করবেন।
১১ ও ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থান করে হাজিরা প্রতিদিন তিনটি জামারায় মোট ২১টি করে পাথর নিক্ষেপ করবেন। পরে বিদায়ী তাওয়াফ শেষে অধিকাংশ হাজি নিজ নিজ দেশে ফিরবেন। অনেকে আবার ওমরাহ পালন ও ইসলামের ঐতিহাসিক নিদর্শন জিয়ারতের জন্য মদিনায় যাবেন।
সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১৫ লাখের বেশি হজযাত্রী পবিত্র হজ পালনে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ আরও কয়েক লাখ মুসল্লি যুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে এবার প্রায় ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজযাত্রী সৌদি আরব গেছেন। তাঁদের মধ্যে ৪ হাজার ৫৬৫ জন সরকারি ব্যবস্থাপনায় এবং ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করছেন।
হজ ব্যবস্থাপনা নির্বিঘ্ন রাখতে সৌদি কর্তৃপক্ষ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। হজ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জিলকদ মাসের শুরু থেকে হাজিদের আবাসন, তাঁবু, আতিথেয়তা কেন্দ্র ও সেবাকেন্দ্র পরিদর্শনে ৮৩ হাজারের বেশি তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। যাতায়াত, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও নির্দেশনামূলক ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
ইসলামে সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ। হজের তিনটি ফরজ হলো—ইহরাম বাঁধা, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান এবং কাবা শরিফ তাওয়াফ করা। মহানবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করে এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকে, সে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে।”


0 মন্তব্যসমূহ