ডিজিটাল সংগীতে বিশ্বজয়: ১৮০ দেশে চট্টগ্রামের তানভীর ইভানের সুরের জাদু
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ| ১১ মে, ২০২৬
ডিজিটাল সংগীতের এই যুগে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি এখন আর শুধু ক্যাসেট বা সিডি বিক্রিতে সীমাবদ্ধ নেই; সাফল্যের নতুন মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম। সেই নতুন ধারার সংগীত বিশ্বে বাংলাদেশের এক নিভৃতচারী শিল্পী হিসেবে নিজের রাজত্ব গড়ে তুলেছেন তরুণ গায়ক তানভীর ইভান। কোনো বড় প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই বর্তমানে বিশ্বের ১৮০টি দেশের প্রায় ২২ লাখ শ্রোতার কানে পৌঁছে গেছে তার কণ্ঠ।
সীমানা পেরিয়ে কোটি কোটি স্ট্রিম
স্পটিফাইয়ের পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের ‘টপ আর্টিস্ট’ হিসেবে নিয়মিত নাম আসছে তানভীর ইভানের। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার গান বাংলাদেশের চেয়ে ভারতেই বেশি শোনা হয়। এছাড়া পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, নেপাল ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতেও তার গানের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। ইউটিউবে ৩৩ লাখ সাবস্ক্রাইবারের চ্যানেলে তার মাত্র ৫০টি গানের বিপরীতে রয়েছে ২৪৮ ধরনের কনটেন্ট, যার সিংহভাগেরই ভিউ কোটির ঘরে।
৩০ কোটির মাইলফলক ও ‘ম্যায়নে রোয়া’
তানভীর ইভানের আন্তর্জাতিক পরিচিতির শুরুটা হয়েছিল ২০১৩ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে পড়ার সময় নিজের লেখা ও সুরে তৈরি করেছিলেন ‘ম্যায়নে রোয়া’ গানটি। ২০১৭ সালে নতুন করে আপলোড করার পর এটি অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা পায়। গত বুধবার পর্যন্ত গানটির ভিউ পৌঁছেছে প্রায় ৩০ কোটিতে। এরপর ‘অভিযোগ’, ‘অভিমান’, ‘ছেড়ে যেয়ো না’, ‘আয়না’, ‘শূন্য’ ও ‘সাগর পাড়ে দাঁড়িয়ে’-এর মতো প্রতিটি গানই শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে গেছে। এর মধ্যে ‘অভিমান’ গানটির জন্য তিনি অর্জন করেছেন মেরিল-প্রথম আলো তারকা জরিপে সেরা গায়কের স্বীকৃতি।
পরিমাণ নয়, গুরুত্ব যখন অনুভূতির
বর্তমান সময়ে যখন প্রতিদিন নতুন ভিডিও বা কনটেন্ট প্রকাশের এক অসম প্রতিযোগিতা চলছে, সেখানে ইভান হাঁটছেন উল্টো পথে। দীর্ঘ ১৩ বছরের ক্যারিয়ারে তার গানের সংখ্যা মাত্র ৫০টির মতো। তিনি সংখ্যার চেয়ে গানের মান এবং শ্রোতাদের আবেগকে প্রাধান্য দেন বেশি। তার গানের মূল শক্তি হলো অপ্রাপ্তি, একাকিত্ব আর এক চিমটি বিরহ, যা সহজেই সাধারণ মানুষের মনের না-বলা কথা হয়ে ওঠে।
ঢাকামুখী স্রোতের বিপরীতে এক শিল্পী
সংগীতের মূল কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা হলেও ইভান তার শেকড় আঁকড়ে আছেন চট্টগ্রামেই। খুলশীর নিজের ঘরে গড়া স্টুডিওতেই তিনি গান লেখেন, সুর করেন এবং কণ্ঠ দেন। খুব বেশি সামাজিক আড্ডা বা বছরে ৩-৪টির বেশি স্টেজ শো-তে তাকে দেখা যায় না। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিল্পী হিসেবে বিশ্বজয় করতে হলে সবসময় ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়া বাধ্যতামূলক নয়; মেধা আর সৃজনশীলতা থাকলে নিজের ঘর থেকেই বিশ্বমঞ্চে পৌঁছানো সম্ভব।
বাবার অনুপ্রেরণা ও আত্মপ্রকাশ
তানভীর ইভান কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করলেও সংগীতকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তার বাবা ইমতিয়াজ বাবুল রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা। বাবার গান গাওয়ার শখই মূলত ইভানকে সংগীতের পথে অনুপ্রাণিত করেছিল। প্রথাগত কোনো তালিম না থাকলেও নিজের চেষ্টা এবং আতিফ আসলামের মতো শিল্পীদের গান শুনে নিজেকে গড়ে তুলেছেন তিনি। বিশেষ করে তার গাওয়া ‘বাবা তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ’ গানটি শুনে ইভানের বাবা-মাও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন।
নিভৃতচারী এই শিল্পীর লক্ষ্য এখন আরও বহুদূর। নিজের ছোট পরিসরে বসেই তিনি বুনে চলেছেন কোটি মানুষের প্রিয় সুরের জাল।
হাতের মুঠোয় সকল খবর — পকেট নিউজ-এর সাথেই থাকুন।

0 মন্তব্যসমূহ