১৪ বছরের ভোগান্তি, ৩ হাজার কোটি টাকার অপচয়: বাতিলের পথে গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ১ জুন, ২০২৬
ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প এখন জনভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনার এক ‘প্রতীকী উদাহরণ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৪ বছর ধরে চলা এই প্রকল্পের পেছনে ইতিমধ্যে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করেও কোনো সুফল না মেলায়, প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল করার আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পটিকে ‘সিস্টেমেটিক ব্যর্থতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এটি বাতিলের সুপারিশ করেছে।
ব্যর্থতার ময়নাতদন্ত: বুয়েটের পর্যবেক্ষণ
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিবেদন অনুযায়ী:
পরিকল্পনায় ত্রুটি: যথাযথ কারিগরি যাচাই, দক্ষ জনবল ও জবাবদিহির অভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সিস্টেমেটিক ব্যর্থতা: এটি অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে একটি বাজে দৃষ্টান্ত।
প্রস্তাবনা: বিশেষজ্ঞ দল বিআরটি কার্যক্রম পুরোপুরি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করেছে।
খরচের খতিয়ান ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
ব্যয়ের পাহাড়: ২০১২ সালে ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা বাজেটে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের ব্যয় কয়েক দফা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে ইতিমধ্যে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকি: প্রকল্পটি চালু করতে আরও প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে বিশেষ বাস কেনা প্রয়োজন, তবে তাতেও যানজট কমার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
অচল অবকাঠামো: প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ১৫টি স্টেশনের চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট এখন অকেজো হয়ে জং ধরছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বেষ্টনীও ভেঙে পড়েছে।
কেন এই পরিণতি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআরটি প্রকল্পের ডিজাইন ও বাস্তবায়নে ছিল চরম সমন্বয়হীনতা:
নকশাগত দুর্বলতা: বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিআরটি সাধারণত ১২-১৪ লেনের সড়কে হলেও, এখানে চার থেকে ছয় লেনের সড়কে এটি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
উড়াল ও সমতল পথের মিশ্রণ: কোথাও উড়ালপথে, আবার কোথাও সমতলে—এই ভুল ধারণার কারণে পুরো প্রকল্পই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
অসমন্বিত কাজ: সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর—তিনটি আলাদা সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকল্পটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ
সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, প্রকল্পটি বাতিল করার পক্ষে জোরালো মত রয়েছে। তবে সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনার পর আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এদিকে, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) মনে করছে, প্রকল্পটি একেবারে শেষ পর্যায়ে থাকায় এখন বাতিল করতে গেলে অতিরিক্ত ১ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।
১৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই প্রকল্প এখন জনবান্ধব হওয়ার পরিবর্তে গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। প্রকল্পটি বাতিল হবে নাকি নতুন বিনিয়োগে আলোর মুখ দেখবে, তা এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
দেশের এই আলোচিত অবকাঠামো প্রকল্পের সর্বশেষ খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন ‘পকেট নিউজ’-এ।
পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর।


0 মন্তব্যসমূহ