প্রকাশ্যে এলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের রূপরেখা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পকেট নিউজ | ১৮ জুন ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। ১৪ দফার এই নথিতে যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু, ইরানের ওপর থেকে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
বুধবার মার্কিন প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নথিটি জনসমক্ষে উপস্থাপন করেন। ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ শিরোনামের এই নথি প্রকাশের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অঙ্গীকার
সমঝোতার প্রথম ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং সংশ্লিষ্ট মিত্ররা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করবে। উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা যুদ্ধের হুমকি থেকেও বিরত থাকবে।
এ ছাড়া লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিষয়টি পরবর্তী চূড়ান্ত চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্য
নথি অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে আলোচনা চালানো হবে। উভয় পক্ষ সম্মত হলে এই সময়সীমা আরও বাড়ানো যেতে পারে।
আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এমওইউ স্বাক্ষরের পর এই আলোচনার সময়সীমা কার্যকর হবে।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার রূপরেখা
সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিক করা।
নথিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরান ৩০ দিনের মধ্যে সমুদ্রপথে স্থাপিত মাইন অপসারণ করবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও নেবে তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারা বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন
চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের পরিকল্পনা।
সমঝোতা অনুযায়ী—
ইরানের তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিতে ছাড় দেওয়া হবে।
ব্যাংকিং, পরিবহন ও বিমা খাতে বিধিনিষেধ শিথিল করা হবে।
জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ ও তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে।
চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে সব ধরনের মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনায় থাকবে।
এ ছাড়া আঞ্চলিক অংশীদারদের সহায়তায় ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়নে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা তৈরির কথাও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সতর্ক সমঝোতা
সমঝোতা স্মারকে ইরান পুনরায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের চেষ্টা করবে না।
একই সঙ্গে মজুত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে নিষ্ক্রিয় করার বিষয়েও নীতিগত ঐকমত্যের কথা বলা হয়েছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, পারমাণবিক স্থাপনার ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো চূড়ান্ত চুক্তির জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
এ কারণে বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে জটিল অধ্যায় এখনো সামনে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় মোড়
সমঝোতা স্মারকের ১৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কমতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অনিষ্পন্ন থাকায় আগামী ৬০ দিনের আলোচনা পর্বই নির্ধারণ করবে এই সমঝোতা স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হবে, নাকি নতুন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সূচনা করবে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online।


0 মন্তব্যসমূহ