যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চূড়ান্ত চুক্তি আলোচনা স্থগিত, শান্তি প্রক্রিয়ায় নতুন অনিশ্চয়তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পকেট নিউজ | ১৯ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শুরু হতে যাওয়া চূড়ান্ত চুক্তি আলোচনা শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নির্ধারিত আলোচনা আপাতত পিছিয়ে দেওয়া হলেও উভয় পক্ষের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতার প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন সদ্য স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারককে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল।
জেনেভা বৈঠক স্থগিত, সফর বাতিল জেডি ভ্যান্সের
শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাঁর নির্ধারিত সফর স্থগিত করেন।
হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানান, আলোচনার প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক সমন্বয় প্রত্যাশার তুলনায় বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাইস প্রেসিডেন্টের সফর আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী বলেও জানানো হয়েছে।
আগেই সই হয়েছে সমঝোতা স্মারক
মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী শুক্রবার জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিকতা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের একদিন আগেই ভার্চ্যুয়ালি নথিতে স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্স থেকে এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তেহরান থেকে ডিজিটাল স্বাক্ষর করেন।
এ ঘটনায় আনুষ্ঠানিক বৈঠকের প্রয়োজনীয়তা কমে গেলেও চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
৬০ দিনের আলোচনায় কী কী বিষয় রয়েছে?
প্রস্তাবিত আলোচনার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা
জব্দ করা ইরানি সম্পদ ও অর্থ ছাড়
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা
আলোচনা চলার সম্ভাব্য সময়সীমা ৬০ দিন নির্ধারণ করা হলেও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান সমঝোতার শর্ত মেনে চললে সময়সীমা নিয়ে তিনি কঠোর অবস্থানে থাকবেন না।
ইসরায়েলকে ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
যদিও ইরান সমঝোতাকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, তবুও চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে হলে আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।
তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তাফা কোসচেশম মনে করেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে ইরান চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারে।
তাঁর মতে, এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে
সব অনিশ্চয়তার মধ্যেও সমঝোতা স্মারকের কিছু ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে।
সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি দিয়ে সীমিত পরিসরে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ফরাসি পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজসহ একাধিক জাহাজ নিরাপদে প্রণালি অতিক্রম করেছে।
এ ছাড়া ইরানের বেশ কয়েকটি জাহাজও আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রা শুরু করেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
শান্তি প্রক্রিয়ার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতে সাত হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানির দাবি করা হয়েছে। যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোও বড় ধাক্কার মুখে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চূড়ান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন এবং আঞ্চলিক পক্ষগুলোর আচরণের ওপর।
বর্তমানে আলোচনা স্থগিত হওয়ায় শান্তি প্রক্রিয়া নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক মহল এখনও স্থায়ী সমাধানের আশাবাদ হারাচ্ছে না।
তথ্যসূত্র: এএফপি,আল-জাজিরা ও বিবিসি
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online।


0 মন্তব্যসমূহ