রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির আশঙ্কা, চলতি অর্থবছরে ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম পেতে পারে সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ২২ জুন ২০২৬
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এনবিআরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। যদিও সংস্থাটি আশা করছে, বছরের শেষ নাগাদ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হবে।
এনবিআরের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা হলেও বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন ব্যয় এবং বাজেট বাস্তবায়নে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
১১ মাসে আদায় প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২০ জুন পর্যন্ত শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর খাত থেকে মোট ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
জুন মাসের প্রথম ২০ দিনে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। সংস্থাটি আশা করছে, মাসের শেষ ১০ দিনে আরও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায় সম্ভব হবে। সে হিসাবে অর্থবছর শেষে মোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা।
যদিও এটি হবে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়, তবুও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি থাকবে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
রাজস্ব বাড়াতে মাঠে তিন টাস্কফোর্স
রাজস্ব আদায়ের গতি বাড়াতে ইতোমধ্যে আয়কর, ভ্যাট এবং শুল্ক বিভাগের জন্য পৃথক তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে এনবিআর।
সংস্থাটি জানিয়েছে, আপিল নিষ্পত্তি, ট্রাইব্যুনাল ও আদালতে ঝুলে থাকা মামলার দ্রুত সমাধান, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি কার্যকর করা এবং বকেয়া কর আদায়ে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহে গতি আনার চেষ্টা চলছে।
আরও পড়ুন
পাঁচ দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের পথে, ২৭ হাজার আমানতকারীকে টাকা ফেরতের উদ্যোগ
বিস্তারিত পড়ুন এখানেরাজস্ব ঘাটতির প্রভাব কোথায় পড়বে
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি হলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ে।
বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থ আসে এনবিআরের মাধ্যমে সংগৃহীত রাজস্ব থেকে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাধ্যতামূলক হওয়ায় এসব খাতে ব্যয় কমানোর সুযোগ খুবই সীমিত।
ফলে অর্থের সংকট দেখা দিলে সাধারণত উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হয়। বর্তমানে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন করছে সরকার। রাজস্ব ঘাটতি অব্যাহত থাকলে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন গতি কমে যেতে পারে কিংবা নতুন প্রকল্প অনুমোদন সীমিত হতে পারে।
কর-জিডিপি অনুপাত এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায়ও কম।
করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে কর কাঠামোর আওতায় আনার মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামনে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা
রাজস্ব আদায়ে নতুন রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনা থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা থেকে বড় ব্যবধান সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেট বাস্তবায়ন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি বজায় রাখা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
অর্থবছরের শেষ কয়েক দিন রাজস্ব সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় সংকোচন অথবা ঋণনির্ভরতা বাড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ