পাঁচ দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের পথে, ২৭ হাজার আমানতকারীকে টাকা ফেরতের উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ২২ জুন ২০২৬
দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ দেশের পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়নের পথে এগোচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ফেরত দিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে উদ্যোগ নিয়েছে। জনগণের করের অর্থ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা দেশের আর্থিক খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অবসায়নের তালিকায় রয়েছে এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর মোট ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।
প্রশাসক নিয়োগের পর শুরু হবে অর্থ ফেরত
কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথমে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ করবে। এরপর ছোট আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে ব্যক্তি আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন। পরবর্তী ধাপে বড় অঙ্কের আমানতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এবং কার্যত অচল হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখার পরিবর্তে দ্রুত অবসায়নের মাধ্যমে আমানতকারীদের দুর্ভোগ কমানোই এখন প্রধান লক্ষ্য।
প্রায় শতভাগ ঋণ খেলাপি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় পুরো ঋণপোর্টফোলিওই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।
আরও পড়ুন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর শুরু, মালয়েশিয়া ও চীনে কূটনীতি-অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা
বিস্তারিত পড়ুন এখানেপি কে হালদার ও এস আলমের ছায়া
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পতনের পেছনে বহুল আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনাও জড়িয়ে রয়েছে। পিপলস লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের হাতে। অন্যদিকে আভিভা ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান ছিলেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম (এস আলম)।
তাঁদের সময়ে বিভিন্ন নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে তুলে নেওয়া হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে আর্থিক সংকটে পড়ে এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা হারায়।
দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনের চেষ্টা
বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছর উচ্চ খেলাপি ঋণ ও আমানত ফেরতে ব্যর্থ ২০টি এনবিএফআইকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। পরে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা মূল্যায়ন করে অবসায়নের জন্য পাঁচটি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করা হয়।
বর্তমান সরকার এরই মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রেখেছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তায় থাকা হাজারো পরিবার কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আর্থিক খাতের জন্য সতর্কবার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের আর্থিক খাতের দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঋণ কেলেঙ্কারির দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরও কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সম্প্রতি জানিয়েছেন, দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই সংকটের সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া তাৎক্ষণিক স্বস্তি আনলেও ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে আর্থিক খাতের সংস্কার, জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং ঋণ জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ