অর্থ পাচার নিয়ে উদ্বেগ,সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ বেড়েছে ৪১ শতাংশ
বিশেষ প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ১৮ জুন ২০২৬
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি)–এর বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি সুইস ফ্রাঁ প্রায় ১৫২ টাকা ধরে হিসাব করলে, সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
চার বছরে সর্বোচ্চ অবস্থানে আমানত
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালের পর ২০২৫ সালেই সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত এক দশকের হিসাবেও এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ আমানত।
এর আগে ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে বৃদ্ধির ধারা শুরু হওয়ার পর ২০২৫ সালে তা আরও দ্রুত গতিতে বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থপ্রবাহ, বৈদেশিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচার—সবকটি বিষয় নিয়েই নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সব অর্থই কি পাচার করা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুইস ব্যাংকে থাকা সব অর্থকে অবৈধ বা পাচার করা অর্থ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংকগুলোর বৈধ আমানতও অন্তর্ভুক্ত থাকে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জমা অর্থও এই হিসাবের মধ্যে আসে।
এসএনবির প্রতিবেদনে দেশভিত্তিক দায় (Liabilities) হিসেবে এসব অর্থ দেখানো হয়। ফলে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে বৈধ ও অবৈধ উভয় ধরনের অর্থই অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
অর্থ পাচার কমেনি—বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
মইনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, মনে করেন সাম্প্রতিক তথ্য উদ্বেগের কারণ।
তাঁর মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আশা করা হয়েছিল বিদেশে অর্থ পাচারের প্রবণতা কমবে। কিন্তু সুইস ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তিনি বলেন, শুধু সুইজারল্যান্ড নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশ থেকে অর্থ স্থানান্তর বা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তাই পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সম্পদ স্থানান্তরের সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের বাইরে চলে যাওয়া সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ তাঁদের সম্পদ এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তর করে থাকতে পারেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন তদন্ত ও অর্থনীতি–সংক্রান্ত প্রতিবেদনে অতীতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব অর্থের একটি অংশও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সুইস ব্যাংকের তথ্য থেকে সরাসরি অর্থ পাচারের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয় বলে অর্থনীতি বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন।
বদলে গেছে সুইস ব্যাংকের গোপনীয়তার সংস্কৃতি
একসময় সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোকে গোপন আমানতের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কঠোর ব্যাংকিং গোপনীয়তার কারণে বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা সেখানে সম্পদ সংরক্ষণ করতেন।
তবে গত এক দশকে আন্তর্জাতিক আর্থিক স্বচ্ছতা চুক্তি এবং অর্থ পাচারবিরোধী নীতিমালার কারণে পরিস্থিতি অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের সরকারের অনুরোধে সুইস কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আর্থিক তথ্য সরবরাহ করে থাকে।
ফলে সরাসরি সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার পরিবর্তে এখন অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা, বিনিয়োগ বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ বেশি শোনা যায়।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদদের মতে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধির এই প্রবণতা সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বৈধ বিদেশি বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য অবৈধ অর্থপ্রবাহকে আলাদা করে চিহ্নিত করা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কার্যকর কৌশল গ্রহণ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online।


0 মন্তব্যসমূহ