ব্যাংক খাত সংস্কারে ৪৫ কোটি ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক, জোর দেওয়া হচ্ছে আমানত সুরক্ষা ও তদারকিতে
(নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ২৪ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ৪৫ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
বুধবার বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ‘আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্প-২’-এর আওতায় এই ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। সংস্থাটি মনে করে, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য একটি শক্তিশালী ও আস্থাশীল ব্যাংক ব্যবস্থা অপরিহার্য।
কোন খাতে ব্যয় হবে ঋণের অর্থ
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যাংক পুনর্গঠন কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করা।
এ প্রকল্পের আওতায়—
আমানত সুরক্ষা তহবিলের মূলধন বৃদ্ধি করা হবে।
ডিপোজিট প্রটেকশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হবে।
জরুরি তারল্য সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
ব্যাংক পুনর্গঠন কৌশল প্রণয়ন করা হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো আধুনিকায়ন করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এসব পদক্ষেপ ব্যাংক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
কেন প্রয়োজন এই সংস্কার
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের ব্যাংক খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব, এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদানের কারণে ঝুঁকি বেড়েছে বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় ৭ দশমিক ৯ শতাংশের তুলনায় চার গুণেরও বেশি।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশ, যা আর্থিক খাতের দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনীতির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে দেশের আর্থিক খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পদ ধারণকারী ব্যাংক খাত বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদার হবে, ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী হবে।
প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তায় গুরুত্ব
প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামোর উন্নয়ন। এর মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা, তথ্য বিশ্লেষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের এই সময়ে শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ব্যাংক খাতের নিরাপত্তা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার সমন্বিত উদ্যোগ
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ তোশিয়াকি ওনো বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের চলমান সংস্কার উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বয় করেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এবং খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়নই হবে এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হলে দেশের ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ