১০ গোলের মহারণে ইংল্যান্ডের ব্রোঞ্জ জয়, সাকার হ্যাটট্রিকেও আলো কেড়ে নিলেন এমবাপ্পে
স্পোর্টস ডেস্ক,পকেট নিউজ|১৯ জুলাই ২০২৬
ফিফা বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচকে অনেকেই ‘সান্ত্বনার লড়াই’ বলে থাকেন। কারণ, যে দুটি দল বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল, তাদের কাছে তৃতীয় হওয়া কখনোই কাঙ্ক্ষিত নয়। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের ব্রোঞ্জ পদকের ম্যাচটি সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে অনুষ্ঠিত ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের এই ম্যাচটি রূপ নেয় এক অবিশ্বাস্য গোল উৎসবে, যেখানে মোট ১০টি গোল হয় এবং শেষ পর্যন্ত ৬-৪ গোলের নাটকীয় জয়ে ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড।
ম্যাচটি শুধু গোলের সংখ্যার জন্যই নয়, বরং ব্যক্তিগত রেকর্ড, বিশ্বকাপ ইতিহাসের নতুন অধ্যায় এবং গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ের কারণেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ইংল্যান্ডের হয়ে বুকায়ো সাকা হ্যাটট্রিক করেন, আর ফ্রান্সের হয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বাধিক গোলের নতুন রেকর্ড গড়েন।
শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ইংল্যান্ড
দুই দলের কোচই ম্যাচের আগে একাদশে সাতটি করে পরিবর্তন আনেন। নিয়মিত অধিনায়ক ও বিশ্বকাপে ৬ গোল করা হ্যারি কেইনকে রাখা হয় বেঞ্চে। কাগজে-কলমে ম্যাচটি গুরুত্বহীন মনে হলেও মাঠের ফুটবল ছিল একেবারেই ফাইনালের মতো।
মাত্র ২ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে ডেক্লান রাইসের দুর্দান্ত দূরপাল্লার শটে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। এরপর ১৮ মিনিটে এজেরি কনসারের হেড থেকে আসে দ্বিতীয় গোল।
প্রথমার্ধের শেষদিকে বুকায়ো সাকা নিজের ঝলক দেখান। ৩৭ এবং যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে টানা দুটি গোল করে ইংল্যান্ডকে ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। প্রথমার্ধ শেষে মনে হচ্ছিল, ফ্রান্স যেন এখনও সেমিফাইনালের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
এমবাপ্পের প্রত্যাবর্তন, রেকর্ডের রাত
দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ফ্রান্সকে দেখা যায়। ৪৮ মিনিটে মাইকেল ওলিসের পাস থেকে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে প্রথম গোল করেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই গোলের মাধ্যমে তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে লিওনেল মেসিকে ছাড়িয়ে যান।
এরপর ৫৪ মিনিটে ব্র্যাডলি বারকোলা ব্যবধান কমিয়ে ৪-২ করেন। ম্যাচে উত্তেজনা আরও বাড়ে ৬৬ মিনিটে, যখন আবারও ওলিসের অ্যাসিস্ট থেকে গোল করেন এমবাপ্পে।
এই গোলটি শুধু ম্যাচেই নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি ছিল এমবাপ্পের বিশ্বকাপে ২২তম গোল, যা তাঁকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসায়। এতদিন এই রেকর্ড ছিল লিওনেল মেসির (২১ গোল) দখলে।
একই সঙ্গে মাইকেল ওলিসে নিজের সপ্তম অ্যাসিস্ট করে এক বিশ্বকাপে সর্বাধিক অ্যাসিস্টের নতুন রেকর্ডও গড়েন। তিনি ভেঙে দেন ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলের করা ছয় অ্যাসিস্টের রেকর্ড।
সাকার হ্যাটট্রিক, ইংল্যান্ডের স্বস্তি
ফ্রান্স যখন ৪-৩ ব্যবধানে ম্যাচে ফিরে আসে, তখন ইংল্যান্ডের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। তবে ৮৭ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন বুকায়ো সাকা। সেই গোল ইংল্যান্ডকে আবারও দুই গোলের নিরাপদ ব্যবধানে নিয়ে যায়।
বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে এটি ছিল মাত্র দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক। এর আগে ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন।
যোগ করা সময়েও থামেনি গোল উৎসব
নির্ধারিত সময়ের পর যোগ করা সময়েও নাটকীয়তা শেষ হয়নি। প্রথমে উসমান দেম্বেলে ফ্রান্সের হয়ে একটি গোল করেন। এরপর বদলি নেমে জুড বেলিংহামও ইংল্যান্ডের হয়ে গোল করে স্কোরলাইন দাঁড় করান ৬-৪।
শেষ বাঁশি বাজতেই নিশ্চিত হয়—
ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের ব্রোঞ্জ পদক জিতেছে।
গত ৬০ বছরের মধ্যে এটি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা সাফল্য।
ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশমের বিদায়টা সুখকর হলো না।
ভাঙল একাধিক ঐতিহাসিক রেকর্ড
এই ম্যাচে একসঙ্গে ভেঙেছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড—
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে সর্বোচ্চ ১০ গোল।
১৯৫৮ সালের ফ্রান্স-পশ্চিম জার্মানি (৬-৩) ম্যাচের রেকর্ড ভাঙল।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে যৌথভাবে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলের ম্যাচ এটি।
কিলিয়ান এমবাপ্পে বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোলদাতার নতুন রেকর্ড গড়লেন (২২ গোল)।
মাইকেল ওলিসে এক বিশ্বকাপে সর্বাধিক ৭ অ্যাসিস্টের নতুন রেকর্ড গড়লেন।
বুকায়ো সাকা বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করা দ্বিতীয় ফুটবলার হলেন।
গোল্ডেন বুটের লড়াই আরও উত্তপ্ত
এমবাপ্পের জোড়া গোল তাঁকে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে দিলেও লড়াই এখনও শেষ নয়। সামনে রয়েছে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মহারণ। ফাইনালে গোল করতে পারলে লিওনেল মেসির সামনে থাকবে আবারও শীর্ষে ফেরার সুযোগ।
ম্যাচের ফল
ইংল্যান্ড ৬-৪ ফ্রান্স
ইংল্যান্ডের গোল
ডেক্লান রাইস (৩')
এজেরি কনসা (১৮')
বুকায়ো সাকা (৩৭', ৪৫+১', ৮৭' পেনাল্টি)
জুড বেলিংহাম (৯০+)
ফ্রান্সের গোল
কিলিয়ান এমবাপ্পে (৪৮', ৬৬')
ব্র্যাডলি বারকোলা (৫৪')
উসমান দেম্বেলে (৯০+)
ম্যাচসেরা
বুকায়ো সাকা (ইংল্যান্ড) — হ্যাটট্রিক করে ইংল্যান্ডকে ব্রোঞ্জ পদক জেতাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন।
দশ গোল, একাধিক রেকর্ড এবং অবিশ্বাস্য নাটকীয়তায় ভরা এই ম্যাচটি নিঃসন্দেহে ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় লড়াইগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ