ইরান যুদ্ধের চাপে কি ফুরিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার? ট্রাম্পের আশ্বাসের বিপরীতে বাড়ছে উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬
তথ্যসূত্র: বিবিসি অবলম্বনে
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সক্ষমতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কয়েক সপ্তাহের টানা হামলা, হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা এবং বিপুল পরিমাণ দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহারের পর মার্কিন অস্ত্রভান্ডার কতটা চাপে রয়েছে—তা নিয়ে ওয়াশিংটন, সামরিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।
যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি গোলাবারুদ রয়েছে, তবে স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণ বলছে—অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত দ্রুত কমে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
মধ্যপ্রাচ্যে ২০টির বেশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর ২০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ অভিযান পরিচালনা করছে। এসব যুদ্ধজাহাজের মূল দায়িত্ব হলো সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা জোরদার করা এবং প্রয়োজনে দ্রুত সামরিক অভিযান পরিচালনা করা।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, পারস্য উপসাগর এবং লোহিত সাগরকে কেন্দ্র করে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ট্রাম্পের বার্তা—‘আরও দ্রুত অস্ত্র বানাও’
চলতি মাসের শুরুতে পেনসিলভানিয়া ডিফেন্স অ্যান্ড ইনোভেশন সামিটে প্রতিরক্ষা শিল্পের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট বার্তা দেন—যুক্তরাষ্ট্রকে আগের চেয়ে দ্রুতগতিতে অস্ত্র উৎপাদন করতে হবে।
তিনি বলেন,
"আমাদের অস্ত্র বিশ্বের সেরা। তবে এগুলো আরও দ্রুত উৎপাদন করতে হবে।"
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও যুদ্ধ সক্ষমতার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন।
৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধ ব্যয়
মার্কিন সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইরানকে কেন্দ্র করে পরিচালিত সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার।
এই অর্থের বড় অংশই ব্যয় হয়েছে—
টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র
প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র
ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা
আকাশ প্রতিরক্ষা অভিযানে
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির আগে মার্কিন বাহিনী ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং একই সময়ে ইরানের ছোড়া ১,৭০০-এর বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
ট্রাম্পের দাবি বনাম গবেষকদের সতর্কতা
যদিও ট্রাম্প ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন,
"আমাদের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি গোলাবারুদ রয়েছে।"
কিন্তু ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কর্নেল মার্ক কানসিয়ান বলেন,
"একটি আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতেই এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। অর্থ দিলেই রাতারাতি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়।"
সবচেয়ে বেশি ক্ষয় হয়েছে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল (TLAM)।
এই ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশিষ্ট্য—
প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে
যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়
উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন বাংকার ধ্বংসে কার্যকর
CSIS-এর হিসাব অনুযায়ী—
যুদ্ধে ১,০০০-এর বেশি টমাহক ব্যবহার হয়েছে।
বর্তমান উৎপাদন গতিতে চললে ২০৩১ সালের আগে যুদ্ধ-পূর্ব মজুত পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
প্রতিটি টমাহকের মূল্য প্রায় ২.৬ মিলিয়ন ডলার।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রও দ্রুত কমছে
ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম।
গবেষণা অনুযায়ী—
যুদ্ধের আগে মজুত ছিল প্রায় ২,৩৩০টি
এর মধ্যে ১,৪৩০টি পর্যন্ত ব্যবহার হয়ে যেতে পারে
প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ, কয়েক হাজার ডলারের একটি ড্রোন ধ্বংস করতে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে—যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও সামরিক উভয় দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ।
থাড ব্যবস্থাও চাপে
শুধু প্যাট্রিয়ট নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা THAAD (Terminal High Altitude Area Defense)-এর মজুতও দ্রুত কমছে।
CSIS-এর হিসাব অনুযায়ী—
যুদ্ধের আগে প্রায় ৩৬০টি THAAD ক্ষেপণাস্ত্র ছিল।
এর মধ্যে ১৯০ থেকে ২৯০টি ইতোমধ্যে ব্যবহার হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে মাত্র ৯টি THAAD ব্যাটারি সক্রিয় রয়েছে, যার ৭টিই যুক্তরাষ্ট্রের।
নতুন উদ্বেগ—চীন ও তাইওয়ান
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রভাব পড়তে পারে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে।
মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় বহুদিন ধরেই আশঙ্কা রয়েছে যে ২০২৭ সালের মধ্যে চীন তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে পারে।
যদি সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পর্যাপ্ত না থাকে, তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধও বাড়াচ্ছে চাপ
ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি ইউক্রেনকেও নিয়মিত সামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন,
যুক্তরাষ্ট্র বছরে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০টি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে, অথচ ইরান অভিযানের প্রথম দিনেই কয়েক শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
এ কারণে ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় প্যাট্রিয়টসহ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরবরাহও ভবিষ্যতে প্রভাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের অবস্থাও দুর্বল
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়—ইরানও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের—
ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামো
ড্রোন তৈরির সক্ষমতা
সামরিক কারখানা
লজিস্টিক নেটওয়ার্ক
গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ইরানের অবশিষ্ট সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে কৌশলগত চাপ তৈরির জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষণ: যুদ্ধ শুধু মাঠেই নয়, কারখানাতেও
সাম্প্রতিক সংঘাত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আধুনিক যুদ্ধের বিজয় শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত হয় না; অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের গতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে দেখিয়ে দিয়েছে—অত্যাধুনিক অস্ত্র যত উন্নতই হোক, সেগুলোর মজুত সীমাহীন নয়। একই সঙ্গে কম খরচের ড্রোন ও ব্যাপক উৎপাদনক্ষম অস্ত্রের যুগে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রনির্ভর প্রতিরক্ষা কৌশল কতটা টেকসই, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে স্বল্পমূল্যের, দ্রুত উৎপাদনযোগ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অস্ত্র প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া।
সংক্ষেপে মূল তথ্য
মধ্যপ্রাচ্যে ২০টির বেশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন।
ইরান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার।
১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
১,৭০০-এর বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
১,০০০-এর বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার হয়েছে।
প্যাট্রিয়ট ও THAAD-এর মজুত দ্রুত কমছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি।
ট্রাম্প অস্ত্র ঘাটতির অভিযোগ অস্বীকার করলেও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সতর্কতা দিচ্ছে।
ইরানও ব্যাপক সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।


0 মন্তব্যসমূহ