‘জুলাই কারও একার নয়, চেতনা দিয়ে ব্যবসা নয়’—রাজনীতিতে নতুন রূপরেখার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
জুলাই আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর, রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনের আহ্বান
সংগৃহীত ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক| পকেট নিউজ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে এর মূল আদর্শ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ‘জুলাই কারও একার সম্পদ নয়। জুলাইয়ের চেতনা দিয়ে ব্যবসা করা উচিত নয়। শুধু রাজনৈতিক স্লোগানের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন রাজনীতি করা সম্ভব নয়।’
রোববার (১৯ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে অনুষ্ঠিত ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের শরিক গণ অধিকার পরিষদ (জিওপি) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
‘জুলাইয়ের চেতনা সবার’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। এটি দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের প্রতীক। তাই এ আন্দোলনের চেতনাকে দলীয় বা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর ভাষায়, জুলাইয়ের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সেই লক্ষ্য অর্জনে সব রাজনৈতিক শক্তিকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
শুধু স্লোগান নয়, চাই স্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শন
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যারা জুলাই আন্দোলনের চেতনার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন বা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন, তাঁদের উচিত জনগণের সামনে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা এবং কর্মসূচি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।
তিনি বলেন, শুধু ‘নতুন বন্দোবস্ত’, ‘দায় ও দরদের রাজনীতি’ কিংবা এ ধরনের আকর্ষণীয় রাজনৈতিক পরিভাষা ব্যবহার করলেই জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব নয়।
রাষ্ট্র পরিচালনা, নির্বাচন ব্যবস্থা, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে কী ধরনের সংস্কার আনা হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা জনগণের সামনে উপস্থাপন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জামায়াত ও এনসিপিকে ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা
বক্তব্যের একপর্যায়ে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে বর্তমান বাস্তবতায় দেশের মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনীতি করতে হবে।
তিনি বলেন,
“যারা সাতচল্লিশের চেতনার কথা বলে, তাদের কাছে গেলে তো অসুবিধা। আমি সংসদে বলেছিলাম, আপনারা তো সাতচল্লিশেও পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন না। একাত্তরে তো ছিলেনই না। এখন দয়া করে চব্বিশে থাকেন। তাহলে জনগণ উপকৃত হবে।”
তিনি আরও বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে কিংবা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জনগণের সমর্থন অর্জন করা সম্ভব নয়।
ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ থাকা স্বাভাবিক। তবে জাতীয় স্বার্থ ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে বিভাজন নয়, ঐক্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়, যা ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে।
তাঁর মতে, জাতীয় ঐকমত্য বজায় রাখা গেলে ভবিষ্যতে স্বৈরাচার বা কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরুত্থান রোধ করা সহজ হবে।
সাংবিধানিক ও আইনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
রাষ্ট্রব্যবস্থা আরও কার্যকর ও গণতান্ত্রিক করতে সাংবিধানিক ও আইনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি জানান, সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সংলাপের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়ন করা হবে।
তাঁর মতে, শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতার ফল।
তিনি বলেন, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল—
বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা
নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা
জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় আরও যারা বক্তব্য দেন
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন—
গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি ও প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন
বক্তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এক নজরে মূল বক্তব্য
জুলাই আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পদ নয়।
জুলাইয়ের চেতনা রাজনৈতিক ব্যবসার হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়।
শুধু স্লোগান নয়, জনগণের সামনে স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা উপস্থাপন করতে হবে।
জাতীয় ঐক্য বজায় রেখে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বান।
সাংবিধানিক ও আইনি সংস্কারে সংসদীয় আলোচনা ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ওপর গুরুত্ব।
ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য অটুট রাখার আহ্বান।
বিশ্লেষণ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। প্রথমত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক বক্তব্যকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান। দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ। তাঁর বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি একটি বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online

0 মন্তব্যসমূহ