‘জুরাসিক পার্ক’-এর কিংবদন্তি তারকা স্যাম নিল আর নেই: পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনের অবসান, শোকে হলিউড

‘জুরাসিক পার্ক’-এর কিংবদন্তি তারকা স্যাম নিল আর নেই: পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনের অবসান, শোকে হলিউড

৭৮ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস; ‘জুরাসিক পার্ক’, ‘দ্য পিয়ানো’ ও ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’-এর তারকা রেখে গেলেন বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্ত, সংগ্রাম, সাফল্য আর অনন্য অভিনয়ের উত্তরাধিকার

বিনোদন ডেস্ক, পকেট নিউজ|১৩ জুলাই ২০২৬

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান 

হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা স্যার স্যাম নিল আর নেই। ‘জুরাসিক পার্ক’-এর অবিস্মরণীয় চরিত্র ড. অ্যালান গ্রান্ট হিসেবে বিশ্বজুড়ে কোটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এই বরেণ্য অভিনেতা ৭৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। সোমবার তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে শান্তিপূর্ণভাবে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন স্যাম নিল। তাঁর মৃত্যুর কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে পরিবার জানিয়েছে, মৃত্যুটি ছিল আকস্মিক এবং মৃত্যুকালে তিনি ক্যানসারমুক্ত ছিলেন।

স্যাম নিলের মৃত্যুর খবরে শুধু হলিউড নয়, বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সিনেমা ও টেলিভিশনে অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বিশ্বের অন্যতম সম্মানিত অভিনেতা হিসেবে।

ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই, তবু হার মানেননি

২০২৩ সালে প্রকাশিত নিজের আত্মজীবনী ‘ডিড আই এভার টেল ইউ অ্যাবাউট দিস?’-এ স্যাম নিল প্রথম প্রকাশ্যে জানান, ২০২২ সালে তাঁর শরীরে ধরা পড়ে অ্যাঞ্জিওইমিউনোব্লাস্টিক টি-সেল লিম্ফোমা, যা বিরল ধরনের এক রক্তের ক্যানসার।

দীর্ঘ চিকিৎসা, কেমোথেরাপি এবং নতুন ধরনের ওষুধের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও তাঁকে নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যে থাকতে হয়েছিল। তবে পরিবার জানিয়েছে, মৃত্যুর সময় তাঁর ক্যানসার সক্রিয় অবস্থায় ছিল না।

ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন,

"মরতে আমার ভয় নেই। কিন্তু বিষয়টি আমাকে বিরক্ত করবে। কারণ আমি আরও ১০ থেকে ২০ বছর বাঁচতে চাই। আমি আমার নাতি-নাতনিদের বড় হতে দেখতে চাই, আমি যে গাছগুলো লাগিয়েছি সেগুলো বড় হতে দেখতে চাই।"

এই বক্তব্য তাঁর জীবনপ্রেম, আশাবাদ এবং পরিবারকেন্দ্রিক মানসিকতার প্রতিফলন হিসেবে ভক্তদের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছিল।

উত্তর আয়ারল্যান্ড থেকে নিউজিল্যান্ড—এক অভিনয় কিংবদন্তির যাত্রা

১৯৪৭ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ওমাহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন স্যাম নিল। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নাইজেল জন ডারমট নিল। ইংরেজ মা এবং নিউজিল্যান্ডের বাবার সন্তান নিলের পরিবার ১৯৫৪ সালে নিউজিল্যান্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।

স্কুলজীবনে একই নামে একাধিক শিক্ষার্থী থাকায় মাত্র ১২ বছর বয়সেই নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘স্যাম’ রাখেন তিনি। পরবর্তীতে এই নামেই তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও সেই পথ দীর্ঘ হয়নি। অভিনয়ের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তাঁকে নিয়ে যায় থিয়েটারের মঞ্চে। নিউজিল্যান্ডের ডাউনস্টেজ থিয়েটারে মাত্র সপ্তাহে ৩৫ ডলার বেতনে পেশাদার অভিনেতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। কখনো কখনো পারিশ্রমিকের সঙ্গে দর্শকদের জন্য রান্না করা খাবারের অতিরিক্ত অংশও পেতেন—যা পরবর্তীতে তিনি হাস্যরসের সঙ্গে স্মরণ করতেন।

নিউজিল্যান্ড থেকে হলিউডের বিশ্বমঞ্চে

স্যাম নিলের অভিনয়জীবনের বড় মোড় আসে ১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত নিউজিল্যান্ডের চলচ্চিত্র ‘স্লিপিং ডগস’ দিয়ে। এই ছবির মাধ্যমে তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন।

পরবর্তী সময়ে ‘মাই ব্রিলিয়ান্ট ক্যারিয়ার’, ‘এভিল অ্যাঞ্জেলস’, **‘দ্য হান্ট ফর রেড অক্টোবর’**সহ একাধিক সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।

তবে ১৯৯৩ সালই তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছর। একই বছরে তিনি অভিনয় করেন অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘দ্য পিয়ানো’-তে। আর ঠিক সেই বছরই স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত ‘জুরাসিক পার্ক’-এ ড. অ্যালান গ্রান্ট চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে তারকাখ্যাতি অর্জন করেন।

মজার বিষয় হলো, এই চরিত্রটি প্রথমে হলিউড সুপারস্টার হ্যারিসন ফোর্ডকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই সুযোগ পান স্যাম নিল এবং তাঁর অভিনয়ই চরিত্রটিকে চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় চরিত্রে পরিণত করে।

পরে তিনি ‘জুরাসিক পার্ক ৩’ এবং ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড: ডোমিনিয়ন’-এ একই চরিত্রে ফিরে এসে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে ১৫০টির বেশি প্রযোজনা

প্রায় অর্ধশতাব্দীর অভিনয়জীবনে স্যাম নিল ১৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনায় অভিনয় করেছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘ডেড ক্যাল্ম’, ‘দ্য জঙ্গল বুক’, ‘ইন দ্য মাউথ অব ম্যাডনেস’, ‘ইভেন্ট হরাইজন’, ‘বাইসেন্টেনিয়াল ম্যান’, **‘পিটার র‍্যাবিট’**সহ আরও অনেক জনপ্রিয় ছবি।

টেলিভিশনেও তিনি ছিলেন সমান সফল। বিশেষ করে জনপ্রিয় সিরিজ ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’-এ দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা মেজর চেস্টার ক্যাম্পবেল চরিত্রে তাঁর অভিনয় সমালোচক ও দর্শকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।

১৯৮৩ সালের মিনিসিরিজ ‘রিলি: এইস অব স্পাইজ’-এ অভিনয়ের জন্য তিনি গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারের মনোনয়নও পেয়েছিলেন।

জেমস বন্ড হওয়ার স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল

আশির দশকে ব্রিটিশ গুপ্তচর জেমস বন্ড চরিত্রে অভিনয়ের অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন স্যাম নিল। ১৯৮৬ সালে তিনি আনুষ্ঠানিক স্ক্রিন টেস্টও দিয়েছিলেন।

তবে শেষ পর্যন্ত প্রযোজকরা টিমোথি ডাল্টনকে বেছে নেন। যদিও অনেক ভক্তের মতে, স্যাম নিল জেমস বন্ড হলে চরিত্রটি ভিন্ন মাত্রা পেতে পারত।

অভিনয়ের বাইরেও ছিল অন্য এক জীবন

ক্যামেরার বাইরেও ছিলেন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের অধিকারী স্যাম নিল।

নিউজিল্যান্ডের সেন্ট্রাল ওটাগো অঞ্চলে তিনি নিজস্ব আঙুরখেত ও ওয়াইনারি পরিচালনা করতেন। কৃষিকাজ, প্রকৃতি এবং প্রাণীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল সুপরিচিত।

রসবোধের জন্যও তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়। নিজের খামারের প্রাণীদের নাম রেখেছিলেন সহশিল্পীদের নামে। একটি মুরগির নাম ছিল লরা ডার্ন, একটি হাঁসের নাম কাইলি মিনোগ, আর একটি গরুর নাম হেলেনা বোনহাম কার্টার—যা তাঁর সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে।

আরো পড়ুন
পোস্ট লোড হচ্ছে...

রাষ্ট্রীয় সম্মান ও উত্তরাধিকার

অভিনয়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯১ সালে তিনি অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (ওবিই) সম্মানে ভূষিত হন।

২০০৭ সালে তিনি লাভ করেন ডিস্টিংগুইশড কম্প্যানিয়ন অব দ্য নিউজিল্যান্ড অর্ডার অব মেরিট। পরে ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নাইটহুড গ্রহণ করলে তাঁর নামের আগে যুক্ত হয় ‘স্যার’ উপাধি।

শোক জানালেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী

স্যাম নিলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, স্যাম নিল অসংখ্য প্রিয় অস্ট্রেলীয় গল্পের অংশ ছিলেন। তাঁর অভিনয়, রসবোধ ও ব্যক্তিত্ব তাঁকে কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে দিয়েছে।

এক অনন্য অধ্যায়ের সমাপ্তি

মৃত্যুকালে স্যার স্যাম নিল রেখে গেছেন চার সন্তান ও ছয় নাতি-নাতনি। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার নিঃসন্দেহে তাঁর অভিনয়জীবন। ডাইনোসরের জগৎ থেকে ঐতিহাসিক নাটক, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার থেকে টেলিভিশনের স্মরণীয় চরিত্র—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

স্যাম নিলের প্রস্থান শুধু একজন অভিনেতার মৃত্যু নয়; এটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো আগামী প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও একইভাবে অনুপ্রেরণা, বিনোদন এবং স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে।

নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online