টুথপেস্টে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ আতঙ্ক: বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান বিএসটিআইয়ের, শুরু হচ্ছে নতুন পরীক্ষা
ইএসডিওর গবেষণার পর জনমনে উদ্বেগ; বৈজ্ঞানিক যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস সরকারি সংস্থার
নিজস্ব প্রতিবেদক| পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই যে পণ্যটি সবচেয়ে বেশি মানুষের হাতে ওঠে, সেটি হলো টুথপেস্ট। কিন্তু সেই টুথপেস্টেই যদি মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির খবর আসে, তবে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে উদ্বেগ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সম্প্রতি একটি বেসরকারি গবেষণায় দেশের বাজারে থাকা বেশ কয়েকটি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) জনগণকে আতঙ্কিত বা বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও আইনগত যাচাই ছাড়া কোনো ব্র্যান্ড বা টুথপেস্টকে অনিরাপদ বা নিম্নমানের হিসেবে ঘোষণা করা সঠিক হবে না।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএসটিআই জানায়, বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তারা বাজার ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কারখানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দেশি ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পুনঃপরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে।
কীভাবে শুরু হলো বিতর্ক?
সম্প্রতি পরিবেশবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) দেশের বাজারে প্রচলিত ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে। গবেষণায় দাবি করা হয়, এর মধ্যে ২৬টি নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
এই তথ্য প্রকাশের পর অনেক ভোক্তার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডগুলো বর্জনের আহ্বান জানান, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের যাচাই-বাছাইহীন তথ্যও ছড়িয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে বিএসটিআই বলেছে, একটি গবেষণার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি যাচাই-বাছাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
বিএসটিআইয়ের অবস্থান কী?
সরকারি মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি বলছে, তারা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
বাজার ও কারখানা থেকে নতুন নমুনা সংগ্রহ
দেশি ও আন্তর্জাতিক পরীক্ষাগারে পুনঃপরীক্ষা
সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা তথ্য সংগ্রহ
উৎপাদক ও আমদানিকারকদের কাছ থেকে কাঁচামালের তথ্য চাওয়া
বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড পর্যালোচনা
বিএসটিআই জানিয়েছে, যদি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নির্ধারিত মান লঙ্ঘন করেছে অথবা অনুমোদনহীন উপাদান ব্যবহার করেছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী?
মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণত ৫ মিলিমিটারের কম আকারের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাকে বোঝানো হয়। এগুলো এত ছোট যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খালি চোখে দেখা যায় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) একে বর্তমানে একটি "Emerging Environmental and Public Health Concern" হিসেবে বিবেচনা করছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
বর্তমান পর্যন্ত মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর টুথপেস্টে পাওয়া সম্ভাব্য মাইক্রোপ্লাস্টিকের নির্দিষ্ট প্রভাব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনও চলমান। অর্থাৎ এটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণা অব্যাহত রয়েছে এবং এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
শুধু কণা পাওয়া মানেই কি পণ্য ক্ষতিকর?
এ প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছে বিএসটিআই।
সংস্থাটি বলছে, কোনো পরীক্ষায় প্লাস্টিকজাত ক্ষুদ্র কণা পাওয়া গেলেই সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
কারণ নির্ধারণ করতে হবে—
কণার প্রকৃতি কী?
এর উৎস কোথায়?
পরিমাণ কত?
এটি উৎপাদনের সময় এসেছে, নাকি অন্য কোনো উৎস থেকে?
মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এর বাস্তব প্রভাব কী?
এসব বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশের মানদণ্ড কী বলছে?
বিএসটিআই জানিয়েছে, বাংলাদেশে টুথপেস্ট উৎপাদনের জন্য নির্ধারিত একটি জাতীয় মান (স্ট্যান্ডার্ড) রয়েছে।
সেখানে উৎপাদনে ব্যবহারের জন্য ৮১টি অনুমোদিত উপাদানের তালিকা রয়েছে। ওই তালিকায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো উল্লেখ নেই।
সংস্থাটি আরও জানায়, কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিএসটিআই সনদ দেওয়ার আগে তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যাচাই করা হয়। ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের সুযোগ খুবই সীমিত।
বিশ্বে কী হচ্ছে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র
২০১৫ সালে Microbead-Free Waters Act পাস করে টুথপেস্টসহ ধৌতযোগ্য কসমেটিকসে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ধাপে ধাপে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উৎপাদকদের ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে বিকল্প উপাদান ব্যবহারের জন্য।
তবে বিএসটিআই জানিয়েছে, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের টুথপেস্ট মানদণ্ডে এখনো মাইক্রোপ্লাস্টিকের গ্রহণযোগ্য মাত্রা বা নিষিদ্ধ ব্যবহারের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই।
এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়েও টুথপেস্টে অনিচ্ছাকৃতভাবে উপস্থিত মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য এখনো একক পরীক্ষাপদ্ধতি কিংবা গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারিত হয়নি।
গবেষণা তথ্যও চাওয়া হয়েছে
বিএসটিআই জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইএসডিওর কাছে—
গবেষণার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন
পরীক্ষার পদ্ধতি
কাঁচা তথ্য (Raw Data)
ল্যাব বিশ্লেষণের তথ্য
চেয়ে পাঠিয়েছে।
একই সঙ্গে উৎপাদক ও আমদানিকারকদের কাছ থেকেও কাঁচামাল এবং সিনথেটিক পলিমার ব্যবহারের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
নতুন মানদণ্ড আসতে পারে
শুধু তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকছে না বিএসটিআই।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞ, পরিবেশ অধিদপ্তর, ওষুধ প্রশাসন, দন্তচিকিৎসক, গবেষক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের নিয়ে টুথপেস্টের জাতীয় মান পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে—
টুথপেস্টে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড ব্যবহারে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা,
উপাদান প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা,
উন্নত পরীক্ষাপদ্ধতি সংযোজন,
নতুন বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন
—এসব পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোক্তাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, তবে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কোনো গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলকে চূড়ান্ত সত্য ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের জন্য অপেক্ষা করা উচিত।
একই সঙ্গে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোরও কাঁচামালের উৎস, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং মান নিয়ন্ত্রণ আরও স্বচ্ছ করার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে ভোক্তাদের আস্থা অটুট থাকে।
ভোক্তাদের জন্য করণীয়
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন—
শুধুমাত্র বিএসটিআই অনুমোদিত টুথপেস্ট ব্যবহার করুন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত যাচাইহীন তথ্য বিশ্বাস করবেন না।
সরকারি সংস্থার চূড়ান্ত পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করুন।
শিশুদের জন্য টুথপেস্ট ব্যবহারে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করুন।
পণ্যের উপাদান তালিকা (Ingredients) পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
সংক্ষেপে
টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও এখনই কোনো ব্র্যান্ডকে দোষী বা অনিরাপদ ঘোষণা করার সুযোগ নেই। বিএসটিআই পুনঃপরীক্ষা, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পর্যালোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সত্যতা যাচাই করছে। পরীক্ষার ফলাফলে অনিয়ম প্রমাণিত হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি। ফলে এই মুহূর্তে ভোক্তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গুজবে নয়, নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য ও সরকারি তদন্তের ফলাফলের ওপর আস্থা রাখা।


0 মন্তব্যসমূহ