সয়াবিন না শর্ষের তেল—কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
স্বাস্থ্য ডেস্ক |পকেট নিউজ
প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারের রান্নাঘরে দীর্ঘদিন ধরেই সয়াবিন তেলের আধিপত্য। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের একটি বড় অংশ রান্নায় সয়াবিন তেলের পরিবর্তে শর্ষের তেল ব্যবহার শুরু করেছেন। অনেকে মনে করেন, শর্ষের তেল সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যকর এবং এটি হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি কি এতটাই সরল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শর্ষের তেলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুণ থাকলেও এটিকে ‘অলৌকিক স্বাস্থ্যকর তেল’ ভাবার সুযোগ নেই। বরং পরিমিত ব্যবহার এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসই সুস্থ থাকার সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
শর্ষের তেলের জনপ্রিয়তা কেন বাড়ছে?
বাঙালির রান্নায় শর্ষের তেলের ব্যবহার নতুন নয়। ভর্তা, ভাজি, মাছ কিংবা বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবারে শর্ষের তেলের স্বাদ ও ঘ্রাণ আলাদা মাত্রা যোগ করে।
বর্তমানে স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে অনেকেই সয়াবিনের পরিবর্তে শর্ষের তেল বেছে নিচ্ছেন। কারণ, এতে স্যাচুরেটেড ফ্যাট তুলনামূলক কম এবং মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে বিবেচিত।
সয়াবিনের তুলনায় কী কী সুবিধা রয়েছে?
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, শর্ষের তেলের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পুষ্টিগুণ হলো—
স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম, ফলে খারাপ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি, যা হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপকারী।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
শরীরে ক্ষতিকর এলডিএল (খারাপ) কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করতে পারে।
অন্যদিকে সয়াবিন তেলে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি থাকলেও আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে অন্যান্য খাবার থেকেও পর্যাপ্ত ওমেগা-৬ পাওয়া যায়। তাই পুষ্টিগত ভারসাম্যের দিক থেকে শর্ষের তেল অনেক ক্ষেত্রেই ভালো বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিতর্কের কেন্দ্রে ‘ইরুসিক অ্যাসিড’
শর্ষের তেল নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হলো এতে থাকা ইরুসিক অ্যাসিড (Erucic Acid)।
প্রাণীর ওপর পরিচালিত কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ইরুসিক অ্যাসিড গ্রহণ করলে হৃদ্পেশিতে চর্বি জমার আশঙ্কা থাকতে পারে।
তবে মানুষের ক্ষেত্রে এমন ক্ষতিকর প্রভাবের সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
এই কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শর্ষের তেল ব্যবহারে নীতিগত পার্থক্য রয়েছে।
কোন দেশ কী বলছে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অবস্থানও এক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের FDA রান্নার জন্য প্রচলিত শর্ষের তেলের অনুমোদন দেয় না।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ইরুসিক অ্যাসিডের সর্বোচ্চ নিরাপদ মাত্রা নির্ধারণ করেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শর্ষের তেল ব্যবহার হয়ে আসছে এবং এ কারণে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রমাণ খুব বেশি পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ কী?
চিকিৎসকদের মতে, কোনো একটি তেলকে একমাত্র স্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের জন্য—
পরিমিত তেল ব্যবহার করতে হবে।
বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যকর তেল পালাক্রমে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভেজালমুক্ত ও মানসম্মত তেল নির্বাচন করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিদিন মোট তেল গ্রহণের পরিমাণ ৪–৫ টেবিল চামচের বেশি হওয়া উচিত নয়, তা সয়াবিন, শর্ষে বা অন্য যেকোনো তেলই হোক।
যাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি
সব মানুষের জন্য শর্ষের তেল সমান উপযোগী নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
লিভারের রোগী
দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগী
গর্ভবতী নারী
সংবেদনশীল পরিপাকতন্ত্রের মানুষ
যাদের শর্ষের তেলে অ্যালার্জি রয়েছে
এ ছাড়া শিশুদের প্রতিদিন শর্ষের তেলে রান্না করা খাবার খাওয়ানো থেকে বিরত থাকারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভেজাল তেল বড় ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শর্ষের তেলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় তেল নয়, বরং ভেজাল।
বাজারে নিম্নমানের বা ভেজাল শর্ষের তেল পাওয়া যায়, যা বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। তাই বিশ্বস্ত উৎস থেকে বিশুদ্ধ তেল কেনার ওপর জোর দিচ্ছেন পুষ্টিবিদরা।
শেষ কথা
বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, শর্ষের তেল সম্পূর্ণ ক্ষতিকর—এমন প্রমাণ যেমন নেই, তেমনি এটিকে শতভাগ নিরাপদ বা অলৌকিক স্বাস্থ্যকর বলারও সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিমিত পরিমাণে খাঁটি শর্ষের তেল ব্যবহার, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তাই সয়াবিন তেল পুরোপুরি বাদ দিয়ে শর্ষের তেলের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ