রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে সেমিফাইনালে ফ্রান্স, ইতিহাসের কেন্দ্রে এমবাপ্পে
মরক্কোকে হারিয়ে নতুন মাইলফলক স্পর্শ দিদিয়ের দেশমের দল; বিশ্বকাপ ইতিহাসে মেসির পাশে, কোথাও আবার ছাড়িয়ে গেলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে
স্পোর্টস ডেস্ক, পকেট নিউজ| ১০ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ফ্রান্স। তবে এই জয় শুধু শেষ চারে ওঠার গল্প নয়, এটি ছিল একের পর এক রেকর্ড গড়ারও উপলক্ষ। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে এবং পুরো ফরাসি দল মিলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে বেশ কয়েকটি অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগের দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে ফ্রান্স। আর সেই আক্রমণের নেতৃত্বে থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে একের পর এক কিংবদন্তি রেকর্ডে নাম লিখিয়ে চলেছেন।
মেসির পাশে, কোথাও আবার মেসিকেও ছাড়িয়ে এমবাপ্পে
মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচে গোল করার পাশাপাশি অ্যাসিস্ট করেছেন এমবাপ্পে, আবার একটি পেনাল্টিও মিস করেছেন। সর্বশেষ ৬০ বছরে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে গোল, অ্যাসিস্ট এবং পেনাল্টি মিস—এই বিরল ঘটনাটি মাত্র চারবার ঘটেছে। বিস্ময়করভাবে চলতি বিশ্বকাপেই মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে।
একই সঙ্গে বিশ্বকাপে তৃতীয়বারের মতো একই ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্টের কীর্তি গড়েছেন এমবাপ্পে। গত ছয় দশকে তাঁর চেয়ে বেশি (৫ বার) এমন কীর্তি আছে শুধু লিওনেল মেসির।
গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে এমবাপ্পে
চলতি বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা এখন ৮, সঙ্গে রয়েছে ৩টি অ্যাসিস্ট। গোলে মেসির সঙ্গে সমতায় থাকলেও বেশি অ্যাসিস্টের কারণে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এখন শীর্ষস্থান দখল করেছেন ফরাসি তারকা।
আরও একটি অনন্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ৮টি জয়সূচক গোল করেছেন এমবাপ্পে, যা যেকোনো ফুটবলারের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এছাড়া চলতি টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ১১টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি। ১৯৭০ বিশ্বকাপে জার্মান কিংবদন্তি গার্ড মুলারের ১৩ গোল-অবদানের পর এটি এক আসরে সর্বোচ্চ।
বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে এমবাপ্পের মোট গোল এখন ২০। সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় তিনি এখন লিওনেল মেসির ২১ গোলের ঠিক পেছনে অবস্থান করছেন।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন উচ্চতায় ফ্রান্স
মরক্কোকে হারিয়ে টানা তিনটি বিশ্বকাপে (২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬) সেমিফাইনালে উঠেছে ফ্রান্স। বিশ্বকাপ ইতিহাসে জার্মানি ও ব্রাজিলের পর তৃতীয় দেশ হিসেবে এই কীর্তি গড়ল দিদিয়ের দেশমের দল।
এ নিয়ে বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সেমিফাইনাল সংখ্যা দাঁড়াল ৮টি। সবচেয়ে বেশি সেমিফাইনাল খেলা দেশের তালিকায় ব্রাজিলের সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে তারা। শীর্ষে রয়েছে ১২ সেমিফাইনাল খেলা জার্মানি।
এছাড়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের মোট জয় এখন ৪৫টি। ইতালির সঙ্গে যৌথভাবে তারা অবস্থান করছে সর্বকালের জয়ের তালিকায় চতুর্থ স্থানে। তাদের ওপরে রয়েছে কেবল ব্রাজিল, জার্মানি ও আর্জেন্টিনা।
দেম্বেলের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন
উসমান দেম্বেলেও এই বিশ্বকাপে নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মরক্কোর বিপক্ষে গোল করে চলতি আসরে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫-এ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে একটি গোলও করতে না পারা দেম্বেলের বিশ্বকাপের সবগুলো গোলই এসেছে ২০২৬ আসরে।
২০০২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে একই বিশ্বকাপে অন্তত দুজন খেলোয়াড়ের পাঁচ বা তার বেশি গোল করার কীর্তি গড়েছে ফ্রান্স। ২০০২ সালে ব্রাজিলের হয়ে রোনালদো করেছিলেন ৮ গোল এবং রিভালদো ৫ গোল। এবার সেই কীর্তি ছুঁয়েছেন এমবাপ্পে (৮) ও দেম্বেলে (৫)।
আক্রমণভাগে ফ্রান্সের আধিপত্য
চলতি বিশ্বকাপে এমবাপ্পে, দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসে—এই তিন তারকা মিলে মোট ২৩টি গোলে অবদান রেখেছেন। যা ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলের বিখ্যাত ‘থ্রি আর’—রোনালদো, রিভালদো ও রোনালদিনিওর সম্মিলিত অবদানের চেয়েও তিনটি বেশি।
এছাড়া গত ৬০ বছরের ইতিহাসে এমবাপ্পেই একমাত্র ফুটবলার, যিনি বিশ্বকাপের দুটি ভিন্ন আসরে সরাসরি ১০ বা তার বেশি গোলে অবদান রাখার কীর্তি গড়েছেন।
পেনাল্টিতে প্রথম ব্যর্থতা, তবু নতুন ইতিহাস
মরক্কোর বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করলেও সেটিই ছিল ফ্রান্সের জার্সিতে এমবাপ্পের প্রথম ব্যর্থতা। এর আগে জাতীয় দলের হয়ে টানা ১৫টি পেনাল্টি সফলভাবে জালে পাঠিয়েছিলেন তিনি। ২০২০ ইউরোতে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে টাইব্রেকারের পর এবারই প্রথম নির্ধারিত সময়ে পেনাল্টি মিস করলেন এই তারকা।
একই সঙ্গে বিশ্বকাপে দিদিয়ের দেশমের অধীনে এমবাপ্পের ম্যাচসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০, যা একই কোচের অধীনে কোনো খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলার রেকর্ড।
বুনুর অনন্য কীর্তি
পরাজিত হলেও মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুও একটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড গড়েছেন। টাইব্রেকারসহ বিশ্বকাপে তাঁর মুখোমুখি হওয়া ৯টি পেনাল্টির মধ্যে মাত্র দুটি গোল হয়েছে। তিনি চারটি পেনাল্টি ঠেকিয়েছেন, আর তিনটি শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে যৌথভাবে সর্বোচ্চ চারটি পেনাল্টি সেভের রেকর্ড এখন তাঁর দখলে।
পরিসংখ্যান যা বলছে
চলতি বিশ্বকাপে ফ্রান্স শুধু জয়ের ধারাবাহিকতাই ধরে রাখেনি, বরং দলীয় শক্তি, আক্রমণভাগের কার্যকারিতা এবং ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের সমন্বয়ে নিজেদের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এমবাপ্পের নেতৃত্বে ফরাসি দল এখন শুধু শিরোপার দাবিদারই নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় লেখার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ