যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো দ্বিতীয়, তবে বাড়ছে প্রতিযোগিতা
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ| ১২ জুলাই ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাকের বাজারে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেও (জানুয়ারি–মে) দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশের অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় এ সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম রপ্তানি বাড়িয়ে শীর্ষ অবস্থান আরও শক্ত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল বিষয়ক সংস্থা অটেক্সার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। যদিও এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তৈরি পোশাক আমদানিই ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ২৮ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রপ্তানি কমার প্রধান কারণ বৈশ্বিক চাহিদার দুর্বলতা।
ভিয়েতনামের আধিপত্য আরও শক্তিশালী
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভিয়েতনাম এখনো শীর্ষ সরবরাহকারী দেশ। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশটি ৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভিয়েতনামের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশটির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের বড় ধাক্কা, সুযোগ নিচ্ছে নতুন প্রতিযোগীরা
দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ অবস্থানে থাকা চীন এবারও বড় ধরনের রপ্তানি সংকোচনের মুখে পড়েছে। জানুয়ারি-মে সময়ে দেশটির রপ্তানি ৪২ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। শুধু মূল্য নয়, রপ্তানির পরিমাণও প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা, পাল্টা শুল্ক এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা উৎপাদনের উৎস বৈচিত্র্যময় করছে। এর ফলে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হয়েছে।
একই সময়ে—
ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, মোট রপ্তানি ১ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার।
কম্বোডিয়ার রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ, মোট রপ্তানি ১ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে ভারতের রপ্তানি ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ফলে দেশটি চতুর্থ স্থান হারিয়ে পঞ্চম অবস্থানে চলে গেছে এবং চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে ইন্দোনেশিয়া।
মে মাসে ফিরছে ইতিবাচক প্রবণতা
বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকের চাহিদা দুর্বল থাকলেও মে মাসে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তৈরি পোশাক আমদানি ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
একই সময়ে—
বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।
চীনের রপ্তানি বেড়েছে ১৮ শতাংশ।
ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি বেড়েছে ২৩ শতাংশ।
কম্বোডিয়ার রপ্তানি বেড়েছে ১৮ শতাংশ।
এটি ইঙ্গিত দেয় যে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বাজার পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে, যদিও প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।
মূল্য প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান
চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের গড় ইউনিট রপ্তানি মূল্য ছিল ২ দশমিক ৯৯ মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২ শতাংশ কম। বৈশ্বিক গড় ইউনিট মূল্য ছিল ৩ দশমিক ১৪ ডলার।
প্রতিযোগী দেশগুলোর গড় ইউনিট মূল্য ছিল—
চীন: ১ দশমিক ৪৩ ডলার
পাকিস্তান: ২ দশমিক ৫৯ ডলার
কম্বোডিয়া: ২ দশমিক ৯১ ডলার
ভিয়েতনাম: ৩ দশমিক ৩৯ ডলার
ভারত: ৩ দশমিক ৪১ ডলার
হন্ডুরাস: ৩ দশমিক ৬৪ ডলার
ইন্দোনেশিয়া: ৩ দশমিক ৭৭ ডলার
মেক্সিকো: ৪ দশমিক ৪৫ ডলার
তথ্য থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের পোশাকের মূল্য চীন, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার তুলনায় বেশি হলেও ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও মেক্সিকোর তুলনায় এখনো কম।
শিল্পমালিকদের উদ্বেগ
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের নেতাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাহিদা কিছুটা বাড়লেও তা এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান দুটি বাণিজ্যিক তদন্ত ভবিষ্যতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এই অনিশ্চয়তা দূর করতে সরকারের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ আরও জোরদার করা জরুরি।
বিশ্লেষণ
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো শক্তিশালী হলেও বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, ভিয়েতনামের ধারাবাহিক অগ্রগতি, চীনের বাজার পুনর্বিন্যাস এবং ইন্দোনেশিয়া-কম্বোডিয়ার দ্রুত উত্থান বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রতিযোগিতার বাস্তবতা তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে বাজার ধরে রাখতে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ