জেলা-উপজেলায় ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণে বড় উদ্যোগ, কমানো হবে অপ্রয়োজনীয় সিজার: স্বাস্থ্য খাতে একাধিক পরিকল্পনা ঘোষণা
প্রতিটি উপজেলায় ডায়ালাইসিস বেড, আধুনিক প্যাথলজি ল্যাব, গ্রামে গ্রামে মিডওয়াইফ সেবা; একই সঙ্গে দালালচক্রের কারণে বাড়ছে সিজারিয়ান অপারেশন—বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ| ১৩ জুলাই ২০২৬
দেশের প্রাথমিক ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবাকে আরও জনমুখী করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণ, উপজেলা হাসপাতালে আধুনিক প্যাথলজি ল্যাব স্থাপন, গ্রামীণ পর্যায়ে মিডওয়াইফ নিয়োগ এবং অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন কমাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার কারণে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে কিডনি রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। এই বাস্তবতা পরিবর্তনে সরকার জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সোনারগাঁও হোটেলে ব্র্যাক আয়োজিত ‘সাসটেইনিং প্লে, লার্নিং অ্যান্ড স্কিলস ইন হিউম্যানিটারিয়ান কনটেক্সটস (স্প্ল্যাশ)’ উদ্যোগের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা ও উপজেলায় বাড়ছে ডায়ালাইসিস সুবিধা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, কিডনি রোগীদের চিকিৎসা সহজলভ্য করতে দেশের প্রতিটি জেলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫০টি নতুন ডায়ালাইসিস বেড সংযোজন করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে ১০টি করে ডায়ালাইসিস বেড স্থাপন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু জেলা নয়, ধাপে ধাপে প্রতিটি উপজেলাতেও ১০টি করে ডায়ালাইসিস বেড চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী বা বিভাগীয় শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার যে চাপ ছিল, তা অনেকটাই কমবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবার সীমিত সুযোগের কারণে অনেক রোগীকে ব্যয়বহুল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার বড় ধরনের সম্প্রসারণ ঘটবে।
সিজারিয়ান অপারেশন নিয়ে উদ্বেগ
অনুষ্ঠানে দেশের প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর পেছনে একটি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, একদল দালাল অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বাড়ি থেকে বিভিন্ন বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যায়, যেখানে প্রয়োজন না থাকলেও সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। এতে শুধু চিকিৎসা ব্যয়ই বাড়ছে না, অনেক ক্ষেত্রে মা ও নবজাতকের জন্য অপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে সিজারিয়ান অপারেশনের পর নবজাতককে মায়ের শালদুধ (কলোস্ট্রাম) পান করানো হয় না। অথচ এই শালদুধ নবজাতকের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা, পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিন সরবরাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষায়, “সিজারিয়ান অপারেশন একটি দালালচক্রের হাতে চলে যাচ্ছে। এই চক্রকে ভেঙে দিয়ে স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করতে হবে।”
তিনি জানান, ইউনিসেফ এবং কয়েকটি উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও এ বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। সরকার ইতোমধ্যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন কমাতে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের কাজ চলছে।
গ্রামীণ মাতৃস্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফ নিয়োগ
মা ও নবজাতকের নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার নতুন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মিডওয়াইফ এবং স্বাস্থ্যপরিচর্যাকারী নিয়োগ দেওয়া হবে, যারা আধুনিক স্ক্রিনিং যন্ত্রপাতি নিয়ে সরাসরি গ্রামে গ্রামে গিয়ে গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রসূতি মায়েদের নিয়মিত স্বাস্থ্যপর্যবেক্ষণ সহজ হবে এবং জটিলতা আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
উপজেলা হাসপাতালে আধুনিক প্যাথলজি ল্যাব
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও ঘোষণা দেন, চলতি বছরের মধ্যেই দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে আধুনিক প্যাথলজি ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে।
তিনি জানান, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং চলতি মাসেই এ বিষয়ে দরপত্র আহ্বান করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন করা গেলে রোগ নির্ণয়ের জন্য জেলা বা রাজধানীতে যাওয়ার প্রয়োজন অনেকাংশে কমে আসবে। এতে রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ পাবেন।
মানবিক সংকটে শিশুদের জন্য ‘স্প্ল্যাশ’ উদ্যোগ
অনুষ্ঠানে ব্র্যাক জানায়, মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের জন্য লেগো ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ‘স্প্ল্যাশ’ নামে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
এই উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশ ও উগান্ডার চার লাখ শিশু খেলাভিত্তিক শিক্ষা, মানসিক সহায়তা এবং জীবনদক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির সুযোগ পাবে।
বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৪৭ কোটি ৩০ লাখ শিশু সংঘাত ও মানবিক সংকটের মধ্যে বসবাস করছে। এর মধ্যে ৫ কোটি ২০ লাখের বেশি শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। এই বাস্তবতায় শিশুদের মানসিক বিকাশ, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ব্র্যাকের কার্যক্রম
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, কক্সবাজারে অতিবৃষ্টি ও ভূমিধসের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন করে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ব্র্যাক সেখানে স্বাস্থ্যসেবা, ওয়ান-রুম স্কুল, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, প্রারম্ভিক শিশুবিকাশ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যাচ্ছে।
ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচি ও মানবিক সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির ঊর্ধ্বতন পরিচালক মো. আকরামুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশের ৪৩টি জেলা ও সাতটি সিটি করপোরেশনে মা ও শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা করছে সংস্থাটি। পাশাপাশি ৬১টি জেলায় চক্ষুসেবা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তিন লাখ মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
পাঁচ কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ব্র্যাক ও লেগো ফাউন্ডেশন পাঁচ কোটি মার্কিন ডলারের অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও উগান্ডায় শিশুদের শিক্ষা ও বিকাশে কাজ করবে।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে এই কর্মসূচি। এর আওতায় জন্ম থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের খেলাভিত্তিক শিক্ষা, প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ, জীবনদক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ, জীবিকায়নের প্রস্তুতি এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
লেগো ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক কর্মসূচির প্রধান তারেক আলামি, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. ইরাম মরিয়াম এবং ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কর্মসূচির প্রধান ডা. রাফিয়াত রশীদ অনুষ্ঠানে শিশুদের বিকাশে খেলাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
স্বাস্থ্য ও শিশু উন্নয়নে সমন্বিত বার্তা
অনুষ্ঠানে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা এবং ব্র্যাক-লেগো ফাউন্ডেশনের মানবিক উদ্যোগ একই মঞ্চে উঠে আসে। একদিকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস, প্যাথলজি ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের ঘোষণা, অন্যদিকে মানবিক সংকটে থাকা শিশুদের শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—দুই উদ্যোগই স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন করা গেলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা রাজধানীকেন্দ্রিক থাকার প্রবণতা কমবে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা প্রাপ্তি সহজ হবে এবং মা ও শিশুস্বাস্থ্যের মান উন্নয়নের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ