বক্স অফিসে ঝড়, দর্শক–সমালোচকের প্রশংসায় ভাসছে ‘দ্য অডিসি’: হোমারের মহাকাব্যে নোলানের নতুন ব্যাখ্যা
যুদ্ধ, অপরাধবোধ, ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা ও মানবিক সংকট—ক্রিস্টোফার নোলানের উচ্চাভিলাষী নির্মাণে নতুন মাত্রা পেল প্রাচীন গ্রিক মহাকাব্য
বিনোদন ডেস্ক | পকেট নিউজ
প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬
বিশ্বখ্যাত নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান আবারও প্রমাণ করলেন, ক্লাসিক সাহিত্যকে আধুনিক চলচ্চিত্রভাষায় রূপ দিতে তিনি কতটা দক্ষ। তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্র ‘দ্য অডিসি’ (The Odyssey) মুক্তির পর থেকেই বিশ্বজুড়ে দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসায় ভাসছে। প্রায় তিন হাজার বছর আগে গ্রিক কবি হোমারের রচিত মহাকাব্যকে অবলম্বন করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র কেবল পৌরাণিক অভিযানের গল্প নয়; বরং যুদ্ধফেরত এক মানুষের মানসিক সংকট, অপরাধবোধ, পরিবারে ফেরার আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানের গভীর মানবিক কাহিনি।
মুক্তির মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ছবিটি বৈশ্বিক বক্স অফিসে ৩৯০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বাংলাদেশেও সিনেমাটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মাল্টিপ্লেক্সে প্রতিদিন ৫০টিরও বেশি শো চলছে এবং প্রথম সপ্তাহেই দেশীয় বক্স অফিসে প্রায় দুই কোটি টাকা আয়ের খবর পাওয়া গেছে।
হোমারের গল্পে নোলানের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
হোমারের মূল মহাকাব্যে ওডেসিয়াস একজন বিজয়ী, কৌশলী ও আত্মবিশ্বাসী যোদ্ধা। কিন্তু নোলানের চলচ্চিত্রে সেই চরিত্রকে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আলোয়। এখানে তিনি যুদ্ধজয়ের গৌরবে উজ্জ্বল নন; বরং দীর্ঘ যুদ্ধ, সহযোদ্ধাদের মৃত্যু, বিচ্ছিন্নতা এবং নিজের সিদ্ধান্তের ভারে ক্লান্ত ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত এক মানুষ।
চিত্রনাট্যে হোমারের মূল কাহিনিকে সম্মান জানানো হলেও পরিচালক বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা, আধুনিক গবেষণা এবং বিশেষ করে এমিলি উইলসনের ইংরেজি অনুবাদ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। ফলে চলচ্চিত্রটি একই সঙ্গে মূল মহাকাব্যের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও আধুনিক দর্শকের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
যুদ্ধের নয়, ঘরে ফেরার সংগ্রামের গল্প
চলচ্চিত্রের শুরুতেই ট্রোজান যুদ্ধের গৌরবগাথা নয়; বরং একজন চারণ কবির গল্প বলার মধ্য দিয়ে দর্শককে নিয়ে যাওয়া হয় এক ভিন্ন জগতে। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় ইথাকার রাজা ওডেসিয়াসের দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রার কাহিনি।
ট্রোজান যুদ্ধ শেষ হওয়ার আট বছর পরও তিনি নিজের রাজ্যে ফিরতে পারেননি। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী পেনেলোপে প্রায় দুই দশক ধরে অপেক্ষা করে যাচ্ছেন স্বামীর জন্য। ছেলে তেলেমাকাস বাবাকে কখনো না দেখেই বড় হয়েছে। রাজপ্রাসাদে অসংখ্য পাত্রের ভিড়, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও পেনেলোপে বিশ্বাস হারান না।
অন্যদিকে স্মৃতিভ্রষ্ট ওডেসিয়াস এক অজানা দ্বীপে নিজের অতীত খুঁজে বেড়ান। পুরো চলচ্চিত্রজুড়ে ধাপে ধাপে উন্মোচিত হয় তাঁর যাত্রার রহস্য।
পৌরাণিক চরিত্রে ভরপুর এক মহাকাব্যিক অভিযান
চলচ্চিত্রে একের পর এক হাজির হয় গ্রিক পুরাণের বিখ্যাত চরিত্রগুলো।
দর্শক দেখতে পান—
একচোখা দৈত্য সাইক্লোপস
মানুষখেকো লায়েস্ট্রিগোনিয়ান
রহস্যময় জাদুকরী সার্সি
অমর দেবী ক্যালিপসো
মোহনীয় সাইরেনরা
জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবী অ্যাথেনা
তবে নোলান এসব পৌরাণিক চরিত্রকে শুধু রোমাঞ্চ সৃষ্টির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং প্রতিটি চরিত্র ওডেসিয়াসের মানসিক যাত্রা এবং আত্মসংঘাতের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তারকাবহুল কাস্ট, শক্তিশালী অভিনয়
চলচ্চিত্রটির অন্যতম বড় আকর্ষণ এর তারকাবহুল অভিনয়শিল্পী দল।
ম্যাট ডেমন ওডেসিয়াস চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন। যুদ্ধফেরত, ক্লান্ত, অনুতপ্ত এবং পরিবারে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ভেঙে পড়া এক মানুষের অনুভূতি তিনি অত্যন্ত সংযত অথচ শক্তিশালী অভিনয়ে তুলে ধরেছেন।
অ্যান হ্যাথাওয়ে পেনেলোপে চরিত্রে সীমিত উপস্থিতি সত্ত্বেও দীর্ঘ প্রতীক্ষায় অবিচল এক নারীর দৃঢ়তা ফুটিয়ে তুলেছেন।
টম হল্যান্ড তেলেমাকাস চরিত্রে বাবাকে না দেখেও তাঁকে খুঁজে ফেরার আবেগ সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন।
রবার্ট প্যাটিনসন অ্যান্টিনাস চরিত্রে ক্ষমতালোভী ও আত্মবিশ্বাসী প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকায় প্রশংসিত হয়েছেন।
অন্যদিকে সামান্থা মর্টনের সার্সি চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র। তাঁর অভিনীত সেই দৃশ্য—যেখানে ক্ষুধার্ত নাবিকদের শূকরে রূপান্তর করা হয়—চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নোলানের পরিচিত নির্মাণশৈলীর প্রতিফলন
সময় নিয়ে খেলা, ভাঙা স্মৃতি, একাধিক টাইমলাইন এবং মনস্তাত্ত্বিক রহস্য—ক্রিস্টোফার নোলানের চলচ্চিত্রের পরিচিত বৈশিষ্ট্যগুলো ‘দ্য অডিসি’-তেও স্পষ্টভাবে ফিরে এসেছে।
বর্তমানের ওডেসিয়াস, অতীতের যুদ্ধ, ইথাকায় অপেক্ষমাণ পেনেলোপে এবং বাবার সন্ধানে বের হওয়া তেলেমাকাস—এই চারটি ভিন্ন সময়রেখা একসঙ্গে এগিয়ে চলে। কিন্তু জটিলতা সৃষ্টি না করে বরং দর্শককে ধীরে ধীরে গল্পের গভীরে নিয়ে যায়।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, এটি নোলানের অন্যতম পরিণত চিত্রনাট্য, যেখানে নন-লিনিয়ার গল্প বলার কৌশল দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে নতুন মাইলফলক
‘দ্য অডিসি’ প্রযুক্তিগত দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
এটি বিশ্বের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, যা সম্পূর্ণ ৭০ মিমি আইম্যাক্স ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে।
চিত্রগ্রাহক হয়টে ভ্যান হয়টেমা প্রাচীন গ্রিসের সমুদ্র, যুদ্ধক্ষেত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে নতুন নান্দনিকতায় তুলে ধরেছেন।
অন্যদিকে লুডভিগ গোরানসনের আবহসংগীত চলচ্চিত্রের আবেগ ও মহাকাব্যিক পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
প্রাকৃতিক আলো, আগুনের শিখা এবং বাস্তব লোকেশনের ব্যবহার ছবিটিকে ভিজ্যুয়ালি আরও শক্তিশালী করেছে।
কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে
সমালোচকদের মতে, প্রায় তিন ঘণ্টার দীর্ঘ রানটাইম থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পৌরাণিক অধ্যায় তুলনামূলকভাবে দ্রুত শেষ হয়েছে।
বিশেষ করে স্কিলা ও ক্যারিবডিস, ক্যালিপসোর দ্বীপ এবং কিছু পার্শ্বচরিত্রের জন্য আরও সময় বরাদ্দ থাকলে গল্প আরও পূর্ণতা পেতে পারত।
এছাড়া যারা শুধুমাত্র বড় মাপের যুদ্ধ কিংবা টানা অ্যাকশন প্রত্যাশা করবেন, তাঁদের কাছে ছবির কিছু অংশ ধীরগতির মনে হতে পারে।
বক্স অফিসে দুর্দান্ত সাফল্য
মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই ৩৯০ মিলিয়ন ডলার আয় করে বছরের অন্যতম সফল চলচ্চিত্রে পরিণত হয়েছে ‘দ্য অডিসি’।
বাংলাদেশেও দর্শকদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের সিনেপ্লেক্সে প্রতিদিন অতিরিক্ত শো যোগ করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলচ্চিত্রটি নিয়ে আলোচনা, রিভিউ এবং বিশ্লেষণ অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষণ: নোলানের সবচেয়ে মানবিক চলচ্চিত্র?
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, ‘দ্য অডিসি’ কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনির আধুনিক সংস্করণ নয়; এটি যুদ্ধোত্তর মানসিক ট্রমা, অপরাধবোধ, স্মৃতি এবং পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার এক গভীর মানবিক উপাখ্যান।
নোলান এখানে দেবতা কিংবা দানবের গল্পের চেয়ে একজন মানুষের ভেতরের যুদ্ধকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই কারণেই চলচ্চিত্রটি কেবল চোখধাঁধানো ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা নয়, বরং দর্শকের আবেগ ও চিন্তার জগতেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
হোমারের কালজয়ী মহাকাব্যকে আধুনিক চলচ্চিত্রভাষায় নতুন ব্যাখ্যায় তুলে ধরে ‘দ্য অডিসি’ প্রমাণ করেছে, হাজার বছরের পুরোনো গল্পও সঠিক নির্মাণশৈলীতে আজকের দর্শকের কাছে সমান প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। এটি শুধু একটি এপিক ফ্যান্টাসি নয়; বরং মানুষের ঘরে ফেরা, আত্মপরিচয় খোঁজা এবং অতীতের মুখোমুখি হওয়ার চিরন্তন গল্প।


0 মন্তব্যসমূহ