ঢাকায় আজও থামছে না বৃষ্টি: দিনভর মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস, জলাবদ্ধতা ও দুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা—সোমবারও রাজধানীতে থেমে থেমে বৃষ্টি চলবে, আকাশ থাকবে মেঘাচ্ছন্ন; উত্তরাঞ্চলে বাড়তে পারে বর্ষণের তীব্রতা, সাত জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত
নিজস্ব প্রতিবেদক
পকেট নিউজ| ১৩ জুলাই ২০২৬
রাজধানীবাসীর বহু প্রতীক্ষিত প্রশ্ন—‘বৃষ্টি কমবে কবে?’—তার উত্তর আপাতত স্বস্তিদায়ক নয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, সোমবারও ঢাকায় বৃষ্টির বিরতি মিললেও পুরো দিনজুড়ে থেমে থেমে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। সকাল থেকেই ঘন মেঘে ঢাকা আকাশ, ঝুম বর্ষণ এবং বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর স্বাভাবিক জনজীবন আবারও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সোমবার দিনের শুরু থেকেই রাজধানীর আবহাওয়া ছিল ভারী মেঘে আচ্ছন্ন। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে শুরু হওয়া ঝুম বৃষ্টি অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলে। যদিও বৃষ্টি একটানা নয়, তবে বিরতি দিয়ে দিনের বিভিন্ন সময়ে আবারও বর্ষণ হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে আকাশ মেঘলা থাকার কারণে রোদ ওঠার সম্ভাবনাও খুব কম।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হামিদ মিয়া জানিয়েছেন, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সারাদিনই বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি টানা বর্ষণ হবে না; সময়ভেদে থেমে থেমে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হলেও দিনের বিভিন্ন সময়ে ভারী বর্ষণ হতে পারে। ফলে নিচু এলাকা ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ অঞ্চলে দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
রোববার দুপুরে আবহাওয়া অধিদপ্তর পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার জন্য দেশের ছয়টি বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছিল। সেই তালিকায় ঢাকা বিভাগও রয়েছে। আবহাওয়া বিশ্লেষকদের মতে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের মধ্যাঞ্চলসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা এখনো শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাব রাজধানীতেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
পরিসংখ্যানও বলছে, গতকাল দেশের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ঢাকা বিভাগে। মাত্র এক দিনেই এখানে ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা মৌসুমি বর্ষণের তীব্রতার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। তবে রাতের দিকে বৃষ্টি কিছুটা কমে আসে। রাত ১২টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত রাজধানীতে মাত্র ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হলেও সকাল সাতটার পর আবারও বৃষ্টির তীব্রতা বৃদ্ধি পায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দিনভর রাজধানীর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকবে এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টির সম্ভাবনা অব্যাহত থাকবে। ফলে বাইরে বের হওয়া মানুষকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
টানা বর্ষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে রাজধানীর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায়। কাকরাইল, কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর, মালিবাগ, মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যান চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় যাত্রীদের অনেকেই বিকল্প হিসেবে রিকশার ওপর নির্ভর করছেন।
তবে এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে কয়েকটি এলাকায় রিকশা ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, স্বল্প দূরত্বের যাত্রাতেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ভাড়া দাবি করছেন কিছু চালক। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং নিম্ন আয়ের যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির মুখে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে বারবার জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হলো অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, খাল দখল, নালা-নর্দমায় বর্জ্য জমে থাকা এবং দ্রুত নগরায়নের ফলে প্রাকৃতিক জলাধার সংকুচিত হয়ে যাওয়া। মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিতেই তাই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো এলাকায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে তাকে ভারী বৃষ্টি হিসেবে ধরা হয়। আর ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলে সেটি অতি ভারী বৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই হিসাবে গতকাল ঢাকা বিভাগের ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত অতি ভারী বর্ষণের পর্যায়ে পড়ে।
রাজধানীর পাশাপাশি দেশের অন্যান্য এলাকাতেও বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলমান বর্ষণে দেশের অন্তত সাতটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিচু এলাকার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। কৃষিজমি, সড়ক এবং গ্রামীণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এতে সেখানে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যের কারণে স্থানীয়ভাবে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
আবহাওয়া বিশ্লেষকদের মতে, বর্ষাকালে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে এ ধরনের বিরতিহীন বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক হলেও নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে রাজধানীতে এর প্রভাব অনেক বেশি অনুভূত হয়। সামান্য সময়ের ভারী বর্ষণেই সড়কে পানি জমে যানজট, যানবাহন বিকল হওয়া এবং নাগরিক দুর্ভোগ নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।
এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও নোংরা পানি বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই অপ্রয়োজনে জলাবদ্ধ এলাকায় চলাচল না করা, বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার এবং শিশু ও বয়স্কদের বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে রাজধানীতে সোমবারও স্বস্তির কোনো আভাস নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দিনভর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকবে এবং থেমে থেমে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলে বর্ষণের তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনা এবং কয়েকটি জেলায় বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক আবহাওয়াকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। ফলে রাজধানীবাসীসহ সারা দেশের মানুষকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ