যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতিতে বাংলাদেশসহ ৬০ দেশ, বাংলাদেশের পণ্যে ১০% শুল্ক কার্যকর
জোরপূর্বক শ্রমবিরোধী নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগ; ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক ঘোষণা ট্রাম্প প্রশাসনের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রম (Forced Labor)-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ও বাস্তবায়নে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণেই নতুন এই বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রেজিস্টার-এ প্রকাশিত এক সরকারি নোটিশে নতুন শুল্ক কাঠামোর ঘোষণা দেওয়া হয়। ঘোষণার অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য শুল্কহার ১০ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা নির্ধারিত সময় থেকে কার্যকর হবে।
বাংলাদেশের জন্য কী ঘোষণা এসেছে?
নতুন নীতিমালায় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পাশাপাশি একই হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার দেশের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে—
ভারত
পাকিস্তান
শ্রীলঙ্কা
মালয়েশিয়া
ইন্দোনেশিয়া
যুক্তরাজ্য
কানাডা
মেক্সিকো
আর্জেন্টিনা
কম্বোডিয়া
ইকুয়েডর
এল সালভাদর
গুয়াতেমালা
হন্ডুরাস
জর্ডান
ত্রিনিদাদ ও টোবাগো
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ যুক্তরাষ্ট্রমুখী রপ্তানি খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। যদিও প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে কোন কোন পণ্যের ওপর এই শুল্ক কার্যকর হচ্ছে এবং বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধার সঙ্গে এর সমন্বয় কীভাবে করা হয়।
কোন দেশগুলোতে ১২.৫ শতাংশ শুল্ক?
ফেডারেল রেজিস্টারের নোটিশ অনুযায়ী, বাকি ৩৮টি দেশের ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই তালিকায় রয়েছে—
চীন
ভিয়েতনাম
ইসরায়েল
অন্যান্য কয়েকটি এশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের ওপরও ১২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বাণিজ্য নীতির ব্যাপক পরিসরকে নির্দেশ করছে।
ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে কী হবে?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যরাষ্ট্র, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে আগে থেকেই কার্যকর থাকা শুল্কের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট ১০ অথবা ১২.৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, এসব দেশের ক্ষেত্রে নতুন শুল্ক সম্পূর্ণ নতুনভাবে আরোপ না হয়ে বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে সমন্বিত হবে।
কেন এই শুল্ক?
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য শনাক্ত ও প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে মানবাধিকার সুরক্ষা এবং শ্রমমান নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে শ্রমনীতি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাণিজ্য কৌশল এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টাও ভূমিকা রাখতে পারে।
কবে থেকে কার্যকর হবে?
ট্রাম্প প্রশাসনের আগে ঘোষিত ১৫০ দিনের জন্য কার্যকর ১০ শতাংশ বৈশ্বিক অস্থায়ী শুল্কের মেয়াদ শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে শেষ হবে।
ঠিক সেই সময় থেকেই নতুন ঘোষিত শুল্কহার কার্যকর হবে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাড়ও রাখা হয়েছে।
যেসব পণ্য ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে, সেগুলো ২৮ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট পর্যন্ত নতুন শুল্কের আওতার বাইরে থাকবে।
এর ফলে পথে থাকা চালানগুলো তাৎক্ষণিক অতিরিক্ত শুল্কের চাপ থেকে সাময়িকভাবে রেহাই পাবে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং কিছু কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।
১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হলে—
বাংলাদেশি পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা কিছুটা কমতে পারে।
রপ্তানিকারকদের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকদের বিকল্প বাজার খোঁজার প্রবণতা বাড়তে পারে।
সরকার ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে নতুন বাণিজ্য কৌশল নিয়ে আলোচনা জোরদার হতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে শুল্কের আওতায় থাকা পণ্যের তালিকা, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার ওপর।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন বার্তা
ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতিতে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র শ্রম অধিকার, মানবাধিকার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতাকে বাণিজ্য নীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করছে।
এ কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়া, ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশই এখন নতুন এই শুল্ক ব্যবস্থার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করছে।
সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত রপ্তানি খাতে কিছুটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে দুই দেশের বাণিজ্যিক আলোচনা, শুল্ক বাস্তবায়নের ধরন এবং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির ওপর। আগামী কয়েক সপ্তাহে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং ব্যবসায়ী মহলের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


0 মন্তব্যসমূহ