নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে উত্তাল ভারত: সংসদমুখী ছাত্র বিক্ষোভে টালমাটাল নয়াদিল্লি, সরকার–পুলিশের কৌশলও ভেঙে পড়ল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পকেট নিউজ (PN)
ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ছাত্র আন্দোলনের সাক্ষী হলো রাজধানী নয়াদিল্লি। বহুল আলোচিত নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রত্যাশী ও তরুণের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ রাজধানীর রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুকে কার্যত অচল করে দেয়। কয়েক স্তরের ব্যারিকেড, প্রায় ৩ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, ইন্টারনেট সেবা সীমিত করা এবং গোয়েন্দা নজরদারি—সবকিছু ভেদ করে বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনের অদূর পর্যন্ত পৌঁছে যান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ ও আটক অভিযান চালায়। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সংগৃহীত ছবি
ঘটনাপ্রবাহ: কীভাবে রাজধানী উত্তপ্ত হলো?
সোমবার সকাল থেকেই নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর, রাইসিনা মার্গ এবং সংসদ ভবনসংলগ্ন এলাকায় হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হতে থাকেন।
পরিকল্পনা ছিল সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের।
শুরুতে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও দুপুরের দিকে বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের দিকে অগ্রসর হন। একপর্যায়ে সংসদ ভবন থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে বাস আড়াআড়িভাবে রেখে পথ বন্ধ করে দেয় পুলিশ।
কিন্তু তাতেও জনস্রোত থামেনি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ প্রথমে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। পরে লাঠিচার্জ শুরু হয়।
কেন এই আন্দোলন?
আন্দোলনের মূল কারণ নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস।
ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা হিসেবে পরিচিত NEET-এ প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই দেশজুড়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি—
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ
প্রশ্নপত্র ফাঁসের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত
দায়ীদের দ্রুত বিচার
পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার
ভবিষ্যতে স্বচ্ছ ও নিরাপদ পরীক্ষা নিশ্চিত করা
নেতৃত্বহীন আন্দোলন, তবু বিশাল জনসমাগম
ভারতের গণমাধ্যমগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল অনেকটাই নেতৃত্বহীন গণআন্দোলন।
যদিও অনলাইনভিত্তিক যুব সংগঠন 'ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)' সংসদ ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দেয়, বাস্তবে আন্দোলনে যোগ দেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রত্যাশী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ।
এটি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সংগঠনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সোনম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনে নতুন গতি
আন্দোলনের আগে থেকেই যন্তর মন্তরে অনশন করছিলেন পরিচিত পরিবেশ ও অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক।
২০ দিনের অনশন চলাকালে ১৮ জুলাই তাঁকে পুলিশ সেখান থেকে সরিয়ে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাই আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়।
ওয়াংচুকের প্রতি সংহতি জানিয়ে কয়েকশ মানুষ বিক্ষোভে যোগ দেন।
সরকারের অবস্থান: কঠোরতা থেকে আলোচনায়
প্রথমদিকে আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নিলেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে।
গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কবার্তার পর কেন্দ্রীয় সরকার প্রথমবারের মতো আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার উদ্যোগ নেয়।
দিল্লি পুলিশের ডিসিপি শচীন শর্মা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
প্রথমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পরে প্রতিমন্ত্রী এবং পরে কেন্দ্রীয় সচিব পর্যায়ের আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন।
তাঁদের একটাই শর্ত ছিল—
মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা।
শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।
কী বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী?
বৈঠক শেষে জে.পি. নাড্ডা জানান,
আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে হয়েছে।
আন্দোলনকারীরা লিখিত দাবি জমা দিয়েছেন।
সরকার বিষয়গুলো বিবেচনা করবে।
আন্দোলন প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে বৈঠকের পরও আন্দোলন পুরোপুরি থামেনি।
সংসদের ভেতরেও বাড়তি তৎপরতা
বিক্ষোভের পাশাপাশি সংসদ ভবনের ভেতরেও শুরু হয় টানা বৈঠক।
বিশেষ করে—
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান
বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল
দফায় দফায় বৈঠক করেন।
যদিও বৈঠকের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে প্রশ্নফাঁস এবং আন্দোলনই ছিল আলোচনার মূল বিষয়।
পুলিশের বক্তব্য
সরকারি সূত্র জানিয়েছে—
প্রথমে পুলিশকে বলপ্রয়োগ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু যখন আন্দোলনকারীরা সংসদের নিরাপত্তা বলয় ভেঙে এগোতে থাকেন, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে—
কাঁদানে গ্যাস
লাঠিচার্জ
আটক অভিযান
চালানো হয়।
এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন।
আন্দোলনে রাজনৈতিক সমর্থনের অভিযোগ
সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি—
বিক্ষোভে কয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকও অংশ নিয়েছেন।
যেসব দলের নাম উঠে এসেছে—
আজাদ সমাজ পার্টি
আম আদমি পার্টি (AAP)
সমাজবাদী পার্টি
তবে আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন, এটি সম্পূর্ণ শিক্ষার্থী ও তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন।
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য
উত্তর প্রদেশের আজমগড় থেকে আসা চাকরিপ্রত্যাশী নীতীশ বলেন,
"প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য সরকারকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। আমরা ন্যায়বিচার চাই।"
তিনি আরও জানান,
প্রথম ব্যারিকেড ভাঙার পর তাঁরা প্রায় বাধাহীনভাবে সংসদের কাছাকাছি পৌঁছে যান।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই আন্দোলন?
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধুমাত্র প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ নয়।
এ আন্দোলন ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা, সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং তরুণ সমাজের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
বেকারত্ব, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে এটি বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের রূপ নিয়েছে।
বিশ্লেষণ
নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা এখন ভারতের শিক্ষা ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। রাজধানীর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে হাজারো শিক্ষার্থীর সংসদ ভবনের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া সরকারের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
সরকার আলোচনার পথ বেছে নিলেও শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলোর বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত আসেনি। ফলে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

0 মন্তব্যসমূহ