গাভির মুখে ভিন্ন সুর: ‘পারেদেসকে নিষিদ্ধ করা উচিত নয়’, বিশ্বকাপ ফাইনালের সংঘর্ষে নতুন বিতর্ক
স্পোর্টস ডেস্ক | পকেট নিউজ
বিশ্বকাপ ফাইনালের রোমাঞ্চকর লড়াই শেষ হওয়ার পর শিরোপা উদ্যাপনের বদলে মাঠে যে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, তা এখনও ফুটবল বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। স্পেনের শিরোপা জয়ের আনন্দ মুহূর্তেই ম্লান হয়ে যায় দুই দলের খেলোয়াড়দের হাতাহাতি ও উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে। সেই ঘটনায় আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস স্পেনের ডিফেন্ডার এরিক গার্সিয়া ও মিডফিল্ডার গাভিকে আঘাত করার অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ইতোমধ্যে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
তবে পুরো ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত মোড় এসেছে সেই খেলোয়াড়ের কাছ থেকেই, যিনি নিজেই পারেদেসের আঘাতের শিকার হয়েছিলেন। স্পেনের তরুণ মিডফিল্ডার গাভি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ঘটনার জন্য পারেদেসকে নিষিদ্ধ করা উচিত হবে না। তাঁর এই মন্তব্য ফুটবল অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ফাইনালের উচ্ছ্বাস থেকে সংঘর্ষ
বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে স্পেনের খেলোয়াড়রা শিরোপা উদ্যাপনে মেতে ওঠেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঠে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে স্প্যানিশ ডিফেন্ডার এরিক গার্সিয়ার সঙ্গে কথাকাটাকাটিতে জড়িয়ে পড়েন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং একপর্যায়ে পারেদেস গার্সিয়াকে ঘুষি মারেন।
এই ঘটনা ঘিরে দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ মাঠে জড়ো হন। স্পেনের খেলোয়াড়েরা সতীর্থকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
গাভিকে আঘাত, ভাইরাল ভিডিও
সংঘর্ষ থামানোর চেষ্টা করেছিলেন স্পেনের মিডফিল্ডার গাভি। কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আর্জেন্টিনার থিয়াগো আলমাদা গাভিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই পারেদেসও গাভির মুখে আঘাত করেন।
আঘাত পেয়ে গাভি মাঠে পড়ে যান। পুরো ঘটনার ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পর অনেকেই পারেদেসের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানান। সাবেক ফুটবলার, বিশ্লেষক এবং সমর্থকদের বড় একটি অংশ তাঁর আচরণকে খেলাধুলার চেতনাবিরোধী বলে মন্তব্য করেন।
তদন্তে নেমেছে ফিফা
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করেছে। ম্যাচ-পরবর্তী শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একজন তদন্তকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ফিফা জানিয়েছে, তদন্তকারীর প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ডিসিপ্লিনারি কমিটি পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। ফুটবল সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রমাণের ভিত্তিতে আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন।
‘এটা ফুটবলেরই অংশ’—গাভির ব্যতিক্রমী অবস্থান
তবে যখন অধিকাংশ মানুষ পারেদেসের কঠোর শাস্তি দাবি করছেন, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন স্পেনের মিডফিল্ডার গাভি।
স্পেনের শিরোপা উদ্যাপনের সময় স্প্যানিশ রেডিও স্টেশন ‘এল পার্তিদাজো দে কোপে’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গাভি বলেন, পারেদেসকে নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই।
তাঁর ভাষায়,
“সত্যি বলতে পারেদেসকে নিষিদ্ধ করা উচিত নয়। বুঝতে পারছি, এটা শিশুদের দেখার জন্য ভালো কিছু নয়। কিন্তু ফুটবলে এমন মারমুখী আচরণ অস্বাভাবিক নয়। ম্যাচের মধ্যে তাকে লাল কার্ড দিলেই বিষয়টি সেখানে শেষ হয়ে যেত। দিনশেষে এটা ফুটবলেরই অংশ।”
গাভির এই মন্তব্য অনেককে বিস্মিত করেছে। কারণ, তিনি নিজেই ওই সংঘর্ষে শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তারপরও প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাপরায়ণ অবস্থান না নিয়ে তিনি মাঠের উত্তেজনাকে খেলাধুলার অংশ হিসেবেই দেখেছেন।
ফুটবল বিশ্লেষকদের কড়া সমালোচনা
গাভির মন্তব্যের সঙ্গে অবশ্য একমত নন অনেক ফুটবল বিশ্লেষক।
ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল আইটিভি-তে সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অধিনায়ক গ্যারি নেভিল আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের আচরণকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের আরেক কিংবদন্তি ফুটবলার অ্যালান শিয়ারার বলেছেন, ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের আচরণ ছিল “খুবই বাজে এবং অগ্রহণযোগ্য।”
তাঁদের মতে, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এমন আচরণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আবেগঘন বার্তা পারেদেসের
ফাইনালের বিতর্কিত ঘটনার পর দেশে ফিরে নিজের ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে যোগ দিয়েছেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস।
ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় তিনি আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উদ্দেশে লেখেন,
“ধন্যবাদ, আর্জেন্টিনা। আজও সব সময়ের মতোই আমি তোমাকে ভালোবাসি। আজ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লিখছি। কারণ, আমরা আমাদের দেশকে সেই আনন্দ এনে দিতে পারিনি, তারা সত্যিই যার যোগ্য ছিল। কিন্তু আমরা সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি এবং আবারও আমাদের পতাকাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় তুলে ধরেছি।”
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাঁর এই বার্তায় ম্যাচ-পরবর্তী সংঘর্ষ বা নিজের বিতর্কিত আচরণ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
শাস্তি নাকি সতর্কবার্তা?
বিশ্বকাপের মতো আসরে ম্যাচ-পরবর্তী সহিংস আচরণ নতুন নয়। অতীতেও এমন ঘটনার জেরে খেলোয়াড়দের জরিমানা, ম্যাচ নিষেধাজ্ঞা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি শাস্তির নজির রয়েছে।
এই ঘটনার ক্ষেত্রেও ফিফার তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করবে পারেদেস বা অন্য কোনো আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে গাভির মতো একজন ভুক্তভোগীর ক্ষমাশীল অবস্থান তদন্তের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ঘটনার তাৎপর্য
বিশ্বকাপ ফাইনাল সাধারণত ফুটবলের সর্বোচ্চ সৌন্দর্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্রীড়াসুলভ মানসিকতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচের পর সংঘর্ষের ঘটনা সেই আনন্দকে অনেকটাই ম্লান করেছে।
একদিকে ফিফার তদন্ত, অন্যদিকে গাভির উদার মন্তব্য—এই দুই ভিন্ন বাস্তবতা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ফুটবলবিশ্ব অপেক্ষা করছে, তদন্ত শেষে ফিফা কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং এই বিতর্ক ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে কী ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।


0 মন্তব্যসমূহ