খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জে ভয়াবহ বন্যা, প্লাবিত ২৫ গ্রাম; পানিবন্দী শত শত পরিবার
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ভেঙে যায় প্রায় ৩০০ ফুট বাঁধ; ডুবে গেছে আঞ্চলিক সড়ক, ব্যাহত যোগাযোগ, ক্ষতির মুখে কৃষিজমি
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ| ১০ জুলাই ২০২৬
টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধ ভেঙে দ্রুত লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় সদর উপজেলার অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে শত শত পরিবার পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসন জানায়, বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১০টার দিকে সদর উপজেলার কালিগঞ্জ–চরহামুয়া এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই তীব্র স্রোতে বাঁধ ভেঙে আশপাশের জনবসতিতে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত পানি বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দেখা গেছে, প্রায় ৩০০ ফুট এলাকাজুড়ে বাঁধ ভেঙে গেছে। ভাঙনের ফলে কালিগঞ্জ, হামুয়া, সুঘর, বনগাঁও, লস্করপুরসহ আশপাশের অন্তত ২৫টি গ্রাম দুই থেকে তিন ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক কাঁচা সড়ক সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়ায় স্থানীয়দের চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে
বন্যার পানিতে হবিগঞ্জ-ভায়া-মিরপুর আঞ্চলিক সড়কের বৈদ্দার বাজার, সুঘর ও বনগাঁও অংশ প্রায় দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে এই সড়ক দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে জরুরি সেবা, পণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
রাতেই সরিয়ে নেওয়া হয় বাসিন্দাদের
বাঁধ ভাঙার পরপরই স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে মাইকিং করে বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের আগে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, আশপাশের স্কুল, মাদ্রাসাসহ অধিকাংশ স্থাপনাও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেতেও দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে অনেক পরিবারকে।
ক্ষোভ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে
স্থানীয়দের অভিযোগ, যে স্থানে বাঁধ ভেঙেছে সেটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। একাধিকবার পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কালিগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, সময়মতো বাঁধটি সংস্কার করা হলে এত বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো। এখন ভাঙনের ফলে শুধু বসতবাড়িই নয়, বিস্তীর্ণ কৃষিজমিও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রশাসনের উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পানিবন্দী মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে শুকনা খাবারসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া শুরু হয়েছে।
পাশাপাশি বাঁধের ভাঙা অংশ দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে খোয়াই নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে প্রশাসন সতর্ক করেছে।
নতুন শঙ্কা আরও বিস্তৃত বন্যার
আবহাওয়া পরিস্থিতি এবং উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত বাঁধ মেরামত এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করা গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে নদীর পানি ও বাঁধের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ