প্রায় দুই দশকের শাসনের অবসান? গাজার ক্ষমতা ছাড়তে প্রস্তুতির ঘোষণা হামাসের
অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কাছে শাসনভার হস্তান্তরের আগ্রহ; যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ত্রাণ কার্যক্রম ও শান্তি প্রক্রিয়ায় নতুন সম্ভাবনার আলোচনা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পকেট নিউজ | ৭ জুলাই ২০২৬
প্রায় দুই দশক ধরে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে আসা হামাস এবার শাসনভার ছেড়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে তারা প্রস্তুত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কাঠামোকেও স্বাগত জানিয়েছে হামাস। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, ভয়াবহ মানবিক সংকট এবং যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টার মধ্যে হামাসের এই ঘোষণা গাজার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করতে পারে।
হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার গণমাধ্যম দপ্তর সোমবার এক বিবৃতিতে জানায়, সংগঠনটি প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তবে কবে, কী প্রক্রিয়ায় এবং কোন শর্তে এই ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। একই সঙ্গে হামাস স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী একতরফাভাবে নিরস্ত্রীকরণের কোনো প্রতিশ্রুতি তারা দেয়নি।
হামাসের এই ঘোষণার সঙ্গে গাজায় আংশিক কার্যকর যুদ্ধবিরতির কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, চলমান সংকট নিরসন এবং গাজার পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই সংগঠনটি প্রশাসনিক নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছে।
হামাস যে প্রশাসনিক কাঠামোর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা বলেছে, সেটি ‘গাজা প্রশাসন–বিষয়ক জাতীয় কমিটি’ (এনসিএজি) নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে এই অন্তর্বর্তী কমিটি গঠন করা হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গাজার প্রশাসন পরিচালনা, জরুরি সেবা পুনর্বহাল এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্য নিয়েই এই কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, হামাসের এই অবস্থান কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা রাজনৈতিক সমাধান ও শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে পৌঁছানো, পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এ ধরনের পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিশ্লেষকেরা এটিও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, হামাস এখনো তাদের সামরিক অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ঘোষণা দেয়নি। ফলে প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর হলেও নিরাপত্তা, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ আলোচনায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ ইতোমধ্যে এক হাজার দিন অতিক্রম করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে গাজা উপত্যকার ৯০ শতাংশের বেশি এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা এখন ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুদ্ধে নারী ও শিশুসহ ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে সীমিত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা এবং আশ্রয়ের সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা একে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছে।
যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার জন্য গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী দেশ ও সংস্থা চেষ্টা চালিয়ে গেলেও স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে হামাসের প্রশাসনিক ক্ষমতা ছাড়ার ঘোষণা নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
তবে এই ঘোষণার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে—ইসরায়েলের অবস্থান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গ্রহণযোগ্যতা, অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা এবং গাজার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি হামাসের এই ঘোষণা বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে প্রায় দুই দশকের প্রশাসনিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে। একই সঙ্গে গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। তবে যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও ক্ষমতার প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান এখনো জটিল হওয়ায় এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
বিশ্বের সব খবর একসাথে পড়তে এখানে ক্লিক করুন
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ