থালাপতি বিজয়ের বিদায়বেলা ‘জন নায়গন’: শেষ সিনেমা ঘিরে উচ্ছ্বাস, তবে গল্প ও দৈর্ঘ্য নিয়ে দর্শকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বিনোদন ডেস্ক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিশ্বজুড়ে মুক্তি পেয়েছে তামিল সুপারস্টার এবং বর্তমান তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়ের বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘জন নায়গন’ (Jana Nayagan)। প্রায় সাত মাস বিলম্বের পর ২৩ জুলাই প্রেক্ষাগৃহে আসে ছবিটি। এটি শুধু একটি নতুন সিনেমার মুক্তিই নয়, বরং বিজয়ের দুই দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
মুক্তির পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ ছবিটি নিয়ে দর্শকদের ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে, বিজয়ের পর্দা উপস্থিতি, আবেগঘন অভিনয় এবং অনিরুদ্ধ রবিচন্দরের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক প্রশংসিত হলেও গল্পের গতি, দীর্ঘ সময় এবং দ্বিতীয়ার্ধের উপস্থাপনা নিয়ে দর্শকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
বিদায়ের ছবিকে ঘিরে ভক্তদের আবেগ
এইচ. বিনোথ পরিচালিত ‘জন নায়গন’ বিজয়ের অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র হওয়ায় মুক্তির আগেই ছবিটি ঘিরে ভক্তদের মধ্যে ছিল তুমুল উন্মাদনা। অনেকেই এটিকে একজন সুপারস্টারের বিদায়ী উপহার হিসেবে দেখছেন।
দর্শকদের বড় একটি অংশের মতে, বয়স ও রাজনৈতিক ব্যস্ততা সত্ত্বেও বিজয় পর্দায় আগের মতোই ক্যারিশমাটিক। তাঁর সংলাপ, অ্যাকশন এবং আবেগঘন দৃশ্যগুলো দর্শকদের মন ছুঁয়েছে। বিশেষ করে সিনেমার শেষভাগে তাঁর উপস্থিতি অনেক ভক্তের জন্য আবেগময় অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে।
গল্প নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
তবে প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও কম হয়নি।
অনেক দর্শকের মতে, ছবির মূল গল্পটি নতুন কিছু উপস্থাপন করতে পারেনি। বরং দক্ষিণ ভারতীয় বাণিজ্যিক সিনেমার পরিচিত ফর্মুলাকেই অনুসরণ করেছে।
একজন দর্শক সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, "ছবিটি মোটামুটি মানের। প্রথমার্ধ গ্রহণযোগ্য হলেও দ্বিতীয়ার্ধে শুধু ফ্ল্যাশব্যাক অংশ কিছুটা আগ্রহ ধরে রাখে। প্রায় তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্য ছবিটিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধীর করে দিয়েছে।"
আরেকজন দর্শক ৫-এর মধ্যে ৩.২৫ রেটিং দিয়ে ছবিটিকে "বিনোদনমূলক" বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, বিজয় ও মামিথা বাইজুর আবেগঘন রসায়ন ছবির অন্যতম শক্তি। একই সঙ্গে অনিরুদ্ধ রবিচন্দরের সংগীতও সিনেমাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
তবে তিনি মনে করেন, ববি দেওলের খলনায়ক চরিত্র আরও শক্তিশালীভাবে নির্মাণ করা যেত এবং ছবির দৈর্ঘ্য কিছুটা কম হলে দর্শকদের অভিজ্ঞতা আরও ভালো হতে পারত।
প্রথমার্ধে ‘ম্যাস’ বিনোদন, দ্বিতীয়ার্ধে গতি হারানোর অভিযোগ
বিজয়ের দীর্ঘদিনের ভক্তদের বড় একটি অংশ প্রথমার্ধ নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট।
তাদের মতে, শুরু থেকেই দর্শকদের জন্য পর্যাপ্ত ‘ম্যাস’ মুহূর্ত, স্টাইলিশ অ্যাকশন এবং উদযাপনের পরিবেশ রয়েছে।
একজন ভক্ত লিখেছেন, "থালাপতির ভক্ত হিসেবে প্রথমার্ধ অসাধারণ লেগেছে। টেকনিক্যাল দিক খুবই শক্তিশালী, যদিও গল্পটি পরিচিত।"
তবে একইসঙ্গে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, দ্বিতীয়ার্ধে গল্পের গতি কমে যায়। বিশেষ করে দীর্ঘ অ্যাকশন দৃশ্য এবং খলনায়কের গল্পরেখা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে আলোচনা
ছবির দ্বিতীয়ার্ধের প্রায় ৪৫ মিনিটের ফ্ল্যাশব্যাক অংশ দর্শকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কিছু দর্শকের মতে, এই অংশে পরিচালকের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। অনেকেই এটিকে বিজয়ের বাস্তব রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে প্রতীকীভাবে সংযুক্ত বলে মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যেহেতু বিজয় বর্তমানে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী, তাই ছবির কিছু সংলাপ ও রাজনৈতিক বার্তা দর্শকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
অনিরুদ্ধর সংগীত প্রশংসার কেন্দ্রবিন্দু
প্রায় সব ধরনের দর্শক প্রতিক্রিয়ায় যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রশংসা পেয়েছে, সেটি হলো অনিরুদ্ধ রবিচন্দরের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর।
অ্যাকশন, আবেগ এবং ক্লাইম্যাক্স—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সংগীত সিনেমার আবহকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মত দিয়েছেন দর্শকরা।
বিশেষ করে টাইটেল কার্ড, ইন্টারভ্যাল ব্লক এবং পোস্ট-ক্রেডিট দৃশ্যের সংগীতকে অনেকেই ছবির অন্যতম সেরা দিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সমালোচনাও রয়েছে
অন্যদিকে কয়েকজন দর্শক ছবির সংলাপ, চিত্রনাট্য এবং সম্পাদনা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
তাদের অভিযোগ, কিছু সংলাপ ডাব করা তেলেগু ছবির মতো শোনায় এবং কয়েকটি দৃশ্য জোর করে যুক্ত করা হয়েছে বলে মনে হয়।
কিছু সমালোচকের মতে, ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি বিজয়ের ব্যক্তিত্ব এবং অনিরুদ্ধর সংগীত; কিন্তু চিত্রনাট্য সেই শক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
শক্তিশালী তারকাবহুল অভিনয়শিল্পী
‘জন নায়গন’-এ বিজয়ের পাশাপাশি অভিনয় করেছেন—
পূজা হেগড়ে
ববি দেওল
মামিথা বাইজু
প্রকাশ রাজ
গৌতম বাসুদেব মেনন
প্রিয়ামণি
নারাইন
পরিচালনায় রয়েছেন এইচ. বিনোথ।
চলচ্চিত্রটি নন্দমুরি বালাকৃষ্ণ অভিনীত ‘ভগবন্ত কেসারি’ থেকে অনুপ্রাণিত বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। যদিও নির্মাতারা এতে নিজেদের সৃজনশীল উপস্থাপনাও যুক্ত করেছেন।
অভিনয় থেকে রাজনীতিতে পূর্ণ সময়
‘জন নায়গন’ কেবল একটি সিনেমার সমাপ্তি নয়, বরং থালাপতি বিজয়ের অভিনয়জীবনের শেষ অধ্যায়ও।
এর মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানিয়ে এখন পুরোপুরি মনোযোগ দিচ্ছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনে।
বহু বছর ধরে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় তারকা হিসেবে পরিচিত বিজয়ের এই বিদায় চলচ্চিত্র তাই ভক্তদের কাছে শুধুই একটি সিনেমা নয়, বরং একটি যুগের সমাপ্তির স্মারক।
সারসংক্ষেপ
প্রথম দিনের দর্শক প্রতিক্রিয়া বলছে, ‘জন নায়গন’ নিখুঁত সিনেমা না হলেও এটি থালাপতি বিজয়ের ভক্তদের জন্য আবেগ, উদযাপন এবং বিদায়ের এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। শক্তিশালী পর্দা উপস্থিতি, অনিরুদ্ধ রবিচন্দরের সংগীত এবং কয়েকটি স্মরণীয় দৃশ্য ছবিটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তবে দীর্ঘ সময়, পরিচিত গল্প এবং দ্বিতীয়ার্ধের গতি নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।
বক্স অফিসে ছবিটি শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হয় এবং সমালোচকদের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নে কী অবস্থান নেয়, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।


0 মন্তব্যসমূহ