বিকাশ মার্চেন্টদের জন্য ব্র্যাক ব্যাংকের ন্যানো ঋণ: এক মিনিটেই মিলবে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা
ডিজিটাল ঋণসেবায় নতুন যুগের সূচনা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করতে ব্র্যাক ব্যাংক-বিকাশের যৌথ উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক| পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল অর্থায়নের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক ও বিকাশ। বিকাশ মার্চেন্টদের জন্য চালু হয়েছে ডিজিটাল ন্যানো ঋণসেবা, যার মাধ্যমে যোগ্য ব্যবসায়ীরা মাত্র এক মিনিটের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতে পারবেন।
ব্যাংকিং খাতে দ্রুত, কাগজবিহীন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ঋণসেবা চালুর এ উদ্যোগকে দেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
গোলটেবিল বৈঠকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীতে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ আয়োজিত ‘বাংলাদেশে অর্থায়নের সুযোগ: বেসরকারি খাতের জন্য আরও সহায়ক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে নতুন এ সেবার বিস্তারিত তুলে ধরেন ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) সৈয়দ আবদুল মোমেন।
তিনি জানান, গত সপ্তাহে পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট) সেবা চালুর পর মাত্র চার দিনেই প্রায় ৪০০টি ঋণ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
এক মিনিটেই আবেদন, যাচাই ও ঋণ বিতরণ
ব্র্যাক ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো এবং ডেটাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার কারণে পুরো প্রক্রিয়া—আবেদন গ্রহণ, তথ্য যাচাই, ঋণ অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়—সবই এক মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
এটি প্রচলিত ব্যাংক ঋণের দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার তুলনায় অনেক দ্রুত এবং সহজ।
সৈয়দ আবদুল মোমেন বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই সেবার মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জরুরি সময়ে কার্যকরী মূলধন সংগ্রহ করতে পারবেন, যা তাদের ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রাথমিকভাবে ৬০ হাজার মার্চেন্ট
বর্তমানে প্রকল্পটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে বিকাশের প্রায় ৬০ হাজার মার্চেন্টকে এই সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে।
পাইলট প্রকল্প সফলভাবে শেষ হলে পর্যায়ক্রমে বিকাশের সব যোগ্য মার্চেন্টের জন্য এই ঋণসেবা উন্মুক্ত করা হবে।
এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র দোকানদার, খুচরা ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা সহজেই প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবেন।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রায়ই জামানত, কাগজপত্র এবং দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে ব্যাংক ঋণ থেকে বঞ্চিত হন।
নতুন এই ন্যানো ঋণসেবার মাধ্যমে সেই বাধা অনেকটাই দূর হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস, মার্চেন্টের ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং আর্থিক আচরণের ভিত্তিতে ঋণ মূল্যায়ন হওয়ায় যোগ্য ব্যবসায়ীরা দ্রুত অর্থায়নের সুযোগ পাবেন।
তথ্য বিনিময়ের সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দিতে গিয়ে সৈয়দ আবদুল মোমেন বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্প্রসারণের অন্যতম বড় বাধা হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিরাপদ তথ্য আদান-প্রদানের সীমাবদ্ধতা।
তিনি বলেন, ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের তথ্য যদি নীতিমালার আওতায় নিরাপদভাবে বিনিময় করা যায়, তাহলে—
ঋণ মূল্যায়ন আরও দ্রুত হবে,
নতুন আর্থিক পণ্য তৈরি সহজ হবে,
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আরও সহজে অর্থায়ন পাবেন,
ঝুঁকি মূল্যায়ন আরও নির্ভুল হবে।
তথ্যভিত্তিক অর্থনীতির দিকে অগ্রগতি
ব্র্যাক ব্যাংকের মতে, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ বাড়লে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য আরও আধুনিক ও উদ্ভাবনী আর্থিক সেবা চালু করা সম্ভব হবে।
এটি শুধু ঋণ বিতরণই সহজ করবে না, বরং ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করে তুলবে।
অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় কী প্রভাব পড়বে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ন্যানো ঋণসেবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য তাৎক্ষণিক মূলধনের সংকট দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে যেসব ব্যবসায়ী প্রতিদিনের বিক্রির ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের জন্য দ্রুত ঋণ পাওয়া ব্যবসা সম্প্রসারণ, পণ্য মজুত বৃদ্ধি এবং নগদ অর্থপ্রবাহ বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
একই সঙ্গে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন
অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড (ডিএফএটি)-এর সহায়তায় আয়োজিত এ গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন—
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন
অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল
পিডব্লিউসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ
এইচএসবিসি বাংলাদেশের হেড অব মাল্টিন্যাশনাল হোলসেল ব্যাংকিং আন্দালিব মির্জাসহ দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষ প্রতিনিধিরা।
সারসংক্ষেপ
বিকাশ মার্চেন্টদের জন্য ব্র্যাক ব্যাংকের চালু করা ডিজিটাল ন্যানো ঋণসেবা বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। মাত্র এক মিনিটে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার সুযোগ ব্যবসায়ীদের কার্যকরী মূলধনের সংকট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।


0 মন্তব্যসমূহ