উত্তর ইরাকে ড্রোন হামলায় উত্তেজনা, গ্যাসক্ষেত্র ও এরবিলে বিস্ফোরণ; নতুন করে বাড়ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা শঙ্কা
খোর মোর গ্যাসক্ষেত্রে হামলার দাবি ইরানি গণমাধ্যমের, এরবিলে একাধিক বিস্ফোরণ; আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান টহল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির আবহের মধ্যেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে উত্তর ইরাকে। কুর্দি–নিয়ন্ত্রিত খোর মোর (Khor Mor) গ্যাসক্ষেত্রে ড্রোন হামলার পাশাপাশি কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের রাজধানী এরবিলে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনায় নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও হামলার দায় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ স্বীকার করেনি, তবে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত হতে পারে। একই সঙ্গে উত্তর ইরাকের জ্বালানি অবকাঠামো ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কৌশলগত গ্যাসক্ষেত্রে ড্রোন হামলার দাবি
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, সোমবার দিবাগত রাতে উত্তর ইরাকের সুলাইমানিয়া অঞ্চলে অবস্থিত খোর মোর গ্যাসক্ষেত্রে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
খোর মোর গ্যাসক্ষেত্র কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা। এখান থেকে উৎপাদিত গ্যাস উত্তর ইরাকের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়। ফলে এই স্থাপনায় যেকোনো হামলা শুধু জ্বালানি উৎপাদন নয়, পুরো অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
তাৎক্ষণিকভাবে হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
এরবিলে একাধিক বিস্ফোরণ
গ্যাসক্ষেত্রে হামলার খবর প্রকাশের প্রায় একই সময়ে উত্তর ইরাকের কুর্দি অঞ্চলের রাজধানী এরবিলে একের পর এক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
ইরাকি সংবাদমাধ্যম এবং ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, মার্কিন কনস্যুলেটের নিকটবর্তী এলাকাসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত সাতটি বিস্ফোরণ হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে রাতের আকাশে বিস্ফোরণের ঝলক এবং বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। যদিও এসব ভিডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
সন্দেহভাজন ইরানি ড্রোন হামলা
আল–জাজিরাকে দেওয়া স্থানীয় পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এরবিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খালিফান ও সোরান এলাকায় অন্তত চারটি ড্রোন হামলা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনগুলো ইরান থেকে পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
হামলার লক্ষ্যবস্তু এলাকাগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুটি ড্রোন লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি এসে বিধ্বস্ত হয়েছে।
আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান
হামলার পরপরই উত্তর ইরাকের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পায়।
স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, এরবিলের আকাশে ১০টিরও বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান ও সামরিক ড্রোন টহল দিতে দেখা গেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি, নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার অংশ হিসেবেই এই নজরদারি পরিচালিত হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেই নতুন উত্তেজনা
গত কয়েক সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানা ১৩ রাতের সামরিক হামলার পর গত শুক্রবার থেকে উভয় পক্ষই হামলা স্থগিত রাখে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, মধ্যস্থতাকারী কয়েকটি দেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কারণে সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। যদিও কিছু মার্কিন সংবাদমাধ্যম দাবি করেছিল, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতির কারণেও হামলার গতি কমানো হয়েছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, হামলা বন্ধের সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ কূটনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া।
ট্রাম্পের আশাবাদী মন্তব্য
মিশিগান সফরে যাওয়ার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে।
তার ভাষায়, "যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ভালো আলোচনা চলছে। ভালো কিছু ঘটার সম্ভাবনা আছে।"
এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উত্তর ইরাকে ড্রোন হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনা সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
খোর মোর গ্যাসক্ষেত্র উত্তর ইরাকের জ্বালানি অবকাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি হামলার কারণে উৎপাদন বা সরবরাহ দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়, তাহলে কুর্দি অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা ও জনজীবনেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষণ
সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে এখনো অত্যন্ত নাজুক, সেটিই আবারও স্পষ্ট করেছে। ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রকাশ্য সামরিক সংঘাত আপাতত থেমে থাকলেও, আঞ্চলিক প্রক্সি উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে কেন্দ্র করে ঝুঁকি এখনো বহাল রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর ইরাকে কৌশলগত স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে হামলার প্রকৃত দায়ী পক্ষ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।


0 মন্তব্যসমূহ