নতুন রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দলীয় সিদ্ধান্তেই, জানালেন মির্জা ফখরুল
‘স্থায়ী কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হবে’—নিজের নামের গুঞ্জন প্রসঙ্গে এড়িয়ে গেলেন বিএনপি মহাসচিব; কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে দিলেন একাধিক দিকনির্দেশনা
নিজস্ব প্রতিবেদক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬
দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন—এই প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন জোর আলোচনা চলছে, তখন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে দল কাকে মনোনয়ন দেবে, সে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। বিষয়টি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে চূড়ান্ত করা হবে।
রোববার (২৬ জুলাই) বগুড়ার শেরপুরে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ)-এর ৩৬তম বার্ষিক পরিকল্পনা সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন নিয়ে যা বললেন মির্জা ফখরুল
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, দলের স্থায়ী কমিটির সভায় আলোচনা ও সিদ্ধান্তের পরই রাষ্ট্রপতি পদে দলের মনোনীত প্রার্থীর নাম জানানো হবে।
তিনি বলেন,
“বিএনপি সভা করবে। স্থায়ী কমিটির সভা হবে, সিদ্ধান্ত হবে, এরপরই জানা যাবে।”
সম্প্রতি বিভিন্ন মহলে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নিজের নাম আলোচনায় থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে বলেন,
“প্লিজ, সংবিধান অনুযায়ী যে সমস্ত নিয়ম আছে, সেটা মেনে দল যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই হবে চূড়ান্ত।”
এর মাধ্যমে তিনি ব্যক্তিগত জল্পনা-কল্পনার পরিবর্তে দলীয় সিদ্ধান্তকেই গুরুত্ব দেন।
রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন কেন?
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী আগামী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে।
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের ওপর জোর
রাষ্ট্রপতি প্রসঙ্গের আগে আরডিএর বার্ষিক পরিকল্পনা সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মির্জা ফখরুল দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি নিয়ে বিস্তৃত দিকনির্দেশনা দেন।
তিনি বলেন, উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রকৃত উন্নয়নের জন্য কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের প্রান্তিক কৃষকরা কঠোর পরিশ্রম করেও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। ফলে কৃষির প্রতি মানুষের আগ্রহ ধীরে ধীরে কমছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর আহ্বান
কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য কমিয়ে কৃষকের হাতে সরাসরি ন্যায্যমূল্য পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, কৃষিপণ্য সরাসরি বাজারজাত করার জন্য বাস্তবমুখী ও আধুনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার আহ্বান জানান।
গবেষণা ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের তাগিদ
মির্জা ফখরুল বলেন, দেশে গবেষক ও উদ্ভাবকদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলেও সেগুলোর যথাযথ প্রচার হয় না। অথচ এসব উদ্ভাবন কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি সরকারি গবেষণার ফল দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া এবং প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহারে বেসরকারি খাতকে আরও সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তরুণদের কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান
অনুষ্ঠানে তরুণদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, শুধুমাত্র সরকারি বা বেসরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।
তিনি বলেন, কৃষিপণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণে আধুনিক উদ্যোগ গ্রহণ করলে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের তরুণরা উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল। সঠিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তারা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে সক্ষম।
সম্মেলনে গ্রামীণ উন্নয়নের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
দুই দিনব্যাপী এ পরিকল্পনা সম্মেলনে পল্লী উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি, সমবায়ভিত্তিক উন্নয়ন, টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষিভিত্তিক কর্মসংস্থান এবং আগামী অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে।
আয়োজকদের মতে, বিভিন্ন কারিগরি অধিবেশন, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং প্রকল্প মূল্যায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ করা হবে।
বিশ্লেষণ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য বিএনপির আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তিনি ব্যক্তিগত সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য না করে দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যা রাজনৈতিকভাবে একটি সতর্ক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, আরডিএর সম্মেলনে তাঁর কৃষি, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির ওপর দেওয়া গুরুত্ব সরকারের গ্রামীণ উন্নয়ন কৌশলের অগ্রাধিকারগুলোও তুলে ধরেছে। বিশেষ করে কৃষকের ন্যায্যমূল্য, আধুনিক বাজারব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণের বিষয়গুলো আগামী দিনের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংক্ষেপে
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী দলীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত হবে।
নিজের নামের গুঞ্জন নিয়ে মন্তব্য এড়িয়ে সংবিধান ও দলীয় সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন মির্জা ফখরুল।
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিপণ্যের আধুনিক বাজারব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
গবেষণা, প্রযুক্তি ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী।
আরডিএর দুই দিনব্যাপী পরিকল্পনা সম্মেলনে ভবিষ্যৎ গ্রামীণ উন্নয়ন ও সমবায় খাতের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে।


0 মন্তব্যসমূহ