যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভুলতে না পারা শিক্ষা’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি মোজতবা খামেনির, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পকেট নিউজ
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্ক। চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরান ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের হাতে যুক্তরাষ্ট্র এমন শিক্ষা পাবে, যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) যুক্তরাষ্ট্র বারবার লঙ্ঘন করেছে।
গত শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক লিখিত বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তির ওপর নির্ভর করা যায় না এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরেরও কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।
সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ
খামেনির বিবৃতিতে বলা হয়, গত মাসে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র সেটি কার্যত অকার্যকর করে দিয়েছে।
তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আবারও প্রমাণ করেছে যে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রক্ষা করে না।
খামেনির ভাষায়,
"চুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বারবার অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। তাদের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর এখন সম্পূর্ণ মূল্যহীন ও অবৈধ।"
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি "আধিপত্যবাদ, আগ্রাসন ও প্রতারণার" ওপর প্রতিষ্ঠিত।
‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ প্রস্তুত রয়েছে
বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সংঘাত আরও বাড়ানোর চেষ্টা করে, তাহলে তার কঠিন মূল্য দিতে হবে।
তিনি বলেন,
"মার্কিন শত্রু যুদ্ধ উসকে দিতে চাইছে। কিন্তু ইরানি জাতি ও প্রতিরোধ ফ্রন্ট তাদের জন্য এমন শিক্ষা প্রস্তুত রেখেছে, যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না।"
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে "প্রতিরোধ ফ্রন্ট" বলতে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকেই বোঝানো হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছে হিজবুল্লাহ, হুথি বিদ্রোহীসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংগঠন।
বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার অভিযোগ
ইরানের দাবি, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেছে।
তেহরানের অভিযোগ অনুযায়ী, মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল—
সেতু
রেলপথ
সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কারখানা
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো
ইরান বলছে, এসব হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের শামিল।
ইরানের পাল্টা হামলার দাবি
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের জবাবে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
তেহরানের দাবি অনুযায়ী হামলার লক্ষ্য ছিল—
বাহরাইন
কাতার
কুয়েত
এছাড়া ভারত মহাসাগরের উত্তরে অবস্থানরত একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজেও হামলার দাবি করেছে ইরান।
যদিও এসব দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তখনও পাওয়া যায়নি।
কুয়েতে অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি
কুয়েত সরকার জানিয়েছে, ইরানের হামলায় দেশটির একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং একটি পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর পর দেশটির কর্তৃপক্ষ জনগণকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি না হয়।
হুতিদের নতুন হুমকি, বাড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট
সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সম্ভাব্য পদক্ষেপ।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের মিত্র হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনটি ঘটলে—
আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হবে।
বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে।
জ্বালানির দাম আরও বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও চাপ বাড়ছে
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলমান এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও সমালোচনার মুখে পড়েছে।
অনেক মার্কিন নাগরিক দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতের বিরোধিতা করছেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান
মোজতবা খামেনি ইরানের জনগণের উদ্দেশে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং দেশের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখতে হবে।
তিনি জনগণকে সংঘাতকালীন সময়ে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন।
সমঝোতার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
গত মাসে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতা স্মারকের লক্ষ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমিয়ে স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি করা।
কিন্তু চুক্তির অল্প সময়ের মধ্যেই উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।
এর ফলে কার্যত ওই সমঝোতা এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষণ: মধ্যপ্রাচ্যে কি আরও বড় সংঘাতের ইঙ্গিত?
মোজতবা খামেনির সাম্প্রতিক বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা, অন্যদিকে ইরানের পাল্টা হুমকি ও আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান নজর।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ