সহজ ড্র, নাকি নিখুঁত পরিকল্পনা? বিশ্বকাপে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১৫ দলের মুখোমুখি না হয়েই ইতিহাস গড়ল আর্জেন্টিনা
১৯৯৪ সালের পর প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনালের আগে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১৫–এর কোনো প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়নি মেসির দল; পরিসংখ্যানে ফুটে উঠল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সহজ পথচলার চিত্র
স্পোর্টস ডেস্ক, পকেট নিউজ|১৩ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে শিরোপার পথে এগিয়ে যেতে হলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারানোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। গ্রুপ পর্ব থেকে নকআউট—প্রতিটি ধাপেই অপেক্ষা করে কঠিন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু চলমান বিশ্বকাপে সেই চেনা চিত্রের বাইরে এক ব্যতিক্রমী ইতিহাস গড়েছে আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন দলটি সেমিফাইনালে পৌঁছেছে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১৫–এর কোনো দলের মুখোমুখি না হয়েই, যা আধুনিক ফুটবল ইতিহাসে নজিরবিহীন।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ওঠা কোনো দলই এমন সুবিধাজনক পথ পায়নি। কারণ ১৯৯২ সালে বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিং পদ্ধতি চালু হওয়ার পর থেকে এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে একটি দল সেমিফাইনালে উঠেছে শীর্ষ ১৫–এর একটি প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও না খেলে।
সুইজারল্যান্ডই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ চারে জায়গা নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। অথচ বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে সুইজারল্যান্ডের অবস্থান ছিল ১৯ নম্বরে, যা আর্জেন্টিনার এ পর্যন্ত প্রতিপক্ষদের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল—
মিসর (র্যাঙ্কিং: ২৯)
কেপ ভার্দে (৬৭)
জর্ডান (৬৩)
অস্ট্রিয়া (২৪)
আলজেরিয়া (২৮)
সুইজারল্যান্ড (১৯)
এই ছয় দলের গড় র্যাঙ্কিং দাঁড়ায় ৩৮, যা ১৯৯৪ সালের পর বিশ্বকাপ ইতিহাসে সেমিফাইনালে ওঠা কোনো দলের প্রতিপক্ষদের মধ্যে সর্বনিম্ন গড় র্যাঙ্কিং।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিসংখ্যানের বিচারে এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সহজ নকআউট যাত্রা।
৩৬ সেমিফাইনালিস্টের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম
১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে বর্তমান আসর পর্যন্ত বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে খেলেছে মোট ৩৬টি দল।
এই ৩৬ দলের মধ্যে শুধু আর্জেন্টিনাই এমন একটি দল, যারা সেমিফাইনালে ওঠার আগে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১৫–এর কোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মাঠে নামেনি।
অন্যদিকে বাকি ৩৫টি দল অন্তত একটি শীর্ষ ১৫ দলের মুখোমুখি হয়েছে সেমিফাইনালে পৌঁছানোর আগেই।
এই হিসাব বিশ্বকাপ শুরুর আগে প্রকাশিত সর্বশেষ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে করা হয়েছে।
অন্যান্য সেমিফাইনালিস্টদের পথ ছিল তুলনামূলক কঠিন
চলমান বিশ্বকাপেই অন্য তিন সেমিফাইনালিস্টকে তুলনামূলক কঠিন প্রতিপক্ষের বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে।
ফ্রান্স গ্রুপ পর্বেই খেলেছে সেনেগাল (১৫)–এর বিপক্ষে এবং কোয়ার্টার ফাইনালে পেয়েছে মরক্কো (৭)–কে।
অন্যদিকে স্পেন নকআউট পর্বে খেলেছে পর্তুগাল (৫) এবং বেলজিয়াম (৯)–এর মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে।
ইংল্যান্ডের পথও তুলনামূলক সহজ ছিল। তারা গ্রুপ পর্বে ক্রোয়েশিয়া (১১) এবং শেষ ষোলোতে মেক্সিকো (১৪)–এর মুখোমুখি হয়েছে। বাকি চার প্রতিপক্ষই ছিল শীর্ষ ১৫–এর বাইরে।
তবে হিসাব যদি শীর্ষ ১০ দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়, তাহলে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড—দুই দলই এখন পর্যন্ত শীর্ষ দশের কোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলেনি।
এবার সেমিফাইনালে অপেক্ষা ইংল্যান্ড
সহজ প্রতিপক্ষ পেরিয়ে সেমিফাইনালে উঠলেও এখন আর্জেন্টিনার সামনে অপেক্ষা করছে বড় পরীক্ষা।
আগামী বুধবার রাতে আটলান্টায় শেষ চারের লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে লিওনেল মেসির দল।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই ম্যাচই হতে পারে আর্জেন্টিনার টুর্নামেন্টের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
অতীতের বিশ্বকাপেও ছিল সহজ পথচলার নজির
যদিও আর্জেন্টিনার মতো এত সহজ পথ আর কেউ পায়নি, তবে কয়েকটি দল তুলনামূলক কম কঠিন প্রতিপক্ষ মোকাবিলা করে সেমিফাইনালে উঠেছিল।
২০১৮ বিশ্বকাপ: ইংল্যান্ড
ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালের আগে শীর্ষ ১৫–এর মাত্র একটি দলের বিপক্ষে খেলতে হয়েছিল।
বেলজিয়াম (র্যাঙ্কিং: ৩)
২০১০ বিশ্বকাপ: উরুগুয়ে
উরুগুয়ের একমাত্র শীর্ষ ১৫ প্রতিপক্ষ ছিল—
ফ্রান্স (৯)
২০০২ বিশ্বকাপ: তুরস্ক
তুরস্ক সেমিফাইনালের আগে শুধু—
ব্রাজিলের (শীর্ষ দল) মুখোমুখি হয়েছিল।
একই বিশ্বকাপে জার্মানিও তুলনামূলক সহজ ড্র পেয়েছিল। তারা খেলেছিল—
আয়ারল্যান্ড (১৫)
যুক্তরাষ্ট্র (১৩)
সবচেয়ে কঠিন পথ পাড়ি দেওয়া দলগুলো
যেখানে আর্জেন্টিনা সবচেয়ে সহজ পথ পেয়েছে, সেখানে কয়েকটি দলকে সেমিফাইনালে উঠতেই চারটি করে শীর্ষ ১৫ দলের বিপক্ষে খেলতে হয়েছে।
মরক্কো (২০২২)
মরক্কোকে খেলতে হয়েছিল—
ক্রোয়েশিয়া (১২)
বেলজিয়াম (২)
স্পেন (৭)
পর্তুগাল (৯)
ফ্রান্স (২০১৮)
শিরোপাজয়ী ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ ছিল—
পেরু (১১)
ডেনমার্ক (১২)
আর্জেন্টিনা (৫)
উরুগুয়ে (১৪)
দক্ষিণ কোরিয়া (২০০২)
সহস্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়া সেমিফাইনালে ওঠার আগে খেলেছিল—
যুক্তরাষ্ট্র (১৩)
পর্তুগাল (৫)
ইতালি (৬)
স্পেন (৮)
পরিসংখ্যান বলছে, আধুনিক বিশ্বকাপ ইতিহাসে এ ধরনের কঠিন পথ খুব কম দলই সফলভাবে অতিক্রম করতে পেরেছে।
সহজ ড্র কি সাফল্যের নিশ্চয়তা?
বিশ্বকাপে সহজ প্রতিপক্ষ পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি সুবিধা। এতে খেলোয়াড়দের শারীরিক চাপ কম থাকে এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে মূল খেলোয়াড়দের ফিট রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে ফুটবল ইতিহাস একই সঙ্গে দেখিয়েছে, সহজ ড্র কখনোই শিরোপার নিশ্চয়তা দেয় না। কারণ সেমিফাইনাল ও ফাইনালের মতো বড় মঞ্চে প্রতিপক্ষের মান, মানসিক চাপ এবং ম্যাচের গুরুত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করে।
আর্জেন্টিনার এবারের যাত্রা তাই পরিসংখ্যানের দিক থেকে যতই ব্যতিক্রমী হোক, শিরোপা জয়ের জন্য এখন তাদের সামনে অপেক্ষা করছে প্রকৃত পরীক্ষার মঞ্চ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল এবং সম্ভাব্য ফাইনালই নির্ধারণ করবে, সহজ পথচলার এই ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফিতে রূপ নেয় কি না।
পরিসংখ্যান এক নজরে
প্রথমবার: ১৯৯৪ সালের পর প্রথম দল হিসেবে শীর্ষ ১৫–এর কোনো প্রতিপক্ষ ছাড়াই সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা।
সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ: সুইজারল্যান্ড (র্যাঙ্কিং ১৯)।
প্রতিপক্ষদের গড় র্যাঙ্কিং: ৩৮।
১৯৯৪ সালের পর সেমিফাইনালিস্ট: ৩৬টি দল।
আর্জেন্টিনা ছাড়া: বাকি ৩৫টি দল অন্তত একটি শীর্ষ ১৫ দলের মুখোমুখি হয়েছিল।
পরবর্তী ম্যাচ: সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা।
এই পরিসংখ্যান আর্জেন্টিনার এবারের বিশ্বকাপ অভিযাত্রাকে ইতিহাসের অন্যতম ব্যতিক্রমী অধ্যায়ে পরিণত করেছে। এখন দেখার বিষয়, তুলনামূলক সহজ ড্রয়ের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে মেসির দল শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে কি না।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ