তেলের দাম ছয় সপ্তাহের সর্বোচ্চে: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বিশ্ববাজারে নতুন অস্থিরতা, বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয় বাড়ার শঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ| ২৩ জুলাই ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ৮৮ ডলার অতিক্রম করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে, যা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ছয় সপ্তাহের সর্বোচ্চ দামে ব্রেন্ট ক্রুড
বৃহস্পতিবারের লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলারের ওপরে উঠে যায়। একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দামও ১ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়ে ৮৮ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
এর আগের দিনও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। ফলে জুনের শুরু থেকে এটাই সর্বোচ্চ মূল্য। কয়েক দিনের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতির ফলে বাজারে আবারও ১০০ ডলার স্পর্শের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাজারে এখন মূল চালিকাশক্তি সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা। উৎপাদনের চেয়ে পরিবহন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগই দামের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতই প্রধান কারণ
তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা।
যুক্তরাষ্ট্র টানা ১২তম রাত ইরানে সামরিক হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হামলার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজে হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাবে।
এই বক্তব্যের পর বাজারে আশঙ্কা তৈরি হয় যে, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে নতুন উত্তেজনা
ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাঞ্চলে মাইন পাতা রয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, ওই এলাকায় বিস্ফোরণে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন ধরে যায় এবং পরে আরও দুটি ট্যাংকার যাত্রাপথ পরিবর্তন করে ফিরে যায়।
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কোনো তেলবাহী জাহাজকে প্রবেশ বা প্রস্থান করতে দেওয়া হবে না।
যদিও এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও বাজারে এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক।
লোহিত সাগরেও বাড়ছে ঝুঁকি
শুধু হরমুজ নয়, লোহিত সাগরেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে এবং বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে।
হুতিদের দাবি, তারা সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে অন্তত একটি সৌদি পতাকাবাহী ট্যাংকার হামলার শিকার হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
এ ছাড়া হুতিরা দাবি করেছে, তাদের সতর্কবার্তার পর প্রায় ১০টি জাহাজ নির্ধারিত রুট পরিবর্তন করেছে। যদিও এ দাবিরও স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। একইভাবে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট বাব আল-মানদেব প্রণালি।
এই দুটি পথ একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়লে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
এ কারণেই বাস্তবে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে আগাম দাম বাড়তে শুরু করেছে।
কেন এখনো ১০০ ডলার ছাড়ায়নি?
বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকের ধারণা ছিল তেলের দাম দ্রুত ১০০ ডলার অতিক্রম করবে। তবে এখনো দাম সেই সীমা অতিক্রম করেনি।
এর কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাজার এখনো বিশ্বাস করছে যে বড় শক্তিগুলো শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। পাশাপাশি ওপেকভুক্ত কিছু দেশের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা বাজারকে আংশিক স্বস্তি দিচ্ছে।
তবে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে এবং তেল পরিবহন দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে খুব দ্রুতই তেলের দাম তিন অঙ্কে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করছেন তারা।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?
বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সরকারের জ্বালানি ভর্তুকির চাপ বাড়তে পারে।
পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্যমূল্যেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ার ফলে বিদ্যুৎ খাতেও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশেষ করে এমন সময়ে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে, যখন বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এলএনজি, জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুৎ খাতে উচ্চ আমদানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা করছে।
বাজারের সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বিশ্ববাজার এখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দিকে নিবিড়ভাবে নজর রাখছে। আগামী কয়েক দিনে সংঘাতের গতিপ্রকৃতি, হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার পরবর্তী ধাপই নির্ধারণ করবে তেলের দামের ভবিষ্যৎ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং সরবরাহে বাস্তব বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্বব্যাপী পরিবহন, উৎপাদন ব্যয়, খাদ্যপণ্যের দাম এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতেও এর প্রতিফলন ঘটতে পারে।


0 মন্তব্যসমূহ