জিদানের হাতেই ফ্রান্সের নতুন অধ্যায়: ২০৩০ পর্যন্ত জাতীয় দলের কোচ, ফিরছে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন
স্পোর্টস ডেস্ক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬
ফরাসি ফুটবলে শুরু হলো এক নতুন যুগ। দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ফ্রান্স জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ হিসেবে কিংবদন্তি মিডফিল্ডার ও সফল কোচ জিনেদিন জিদানকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দিয়েছে ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশন (FFF)। ২০৩০ সাল পর্যন্ত মেয়াদের এই চুক্তির মাধ্যমে জাতীয় দলের দায়িত্ব গ্রহণ করছেন ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী এই তারকা, যিনি খেলোয়াড় ও কোচ—দুই পরিচয়েই বিশ্ব ফুটবলে নিজের অনন্য অবস্থান তৈরি করেছেন।
এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে দিদিয়ের দেশমের দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। ২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে সেমিফাইনালে হেরে বিদায়ের পর নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। যদিও বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার আগেই ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলো জিদানের দায়িত্ব নেওয়ার খবর প্রকাশ করেছিল, এবার সেটিই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করল ফেডারেশন।
কিংবদন্তির কাঁধে নতুন দায়িত্ব
ফ্রান্স জাতীয় দলের জার্সিতে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন জিনেদিন জিদান। সেই বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে তাঁর জোড়া গোল আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। এরপর ইউরো ২০০০ জয়ে নেতৃত্ব দিয়ে নিজেকে ফ্রান্সের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
খেলোয়াড়ি জীবনের পর কোচিংয়েও সমান সাফল্য পান জিদান। স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নিয়ে টানা তিনবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে ইতিহাস গড়েন তিনি। আধুনিক ফুটবলে এমন কীর্তি আর কোনো কোচের নেই। ২০২১ সালে দ্বিতীয় দফায় রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব ছাড়ার পর প্রায় পাঁচ বছর তিনি কোচিং থেকে দূরে ছিলেন।
অবশেষে বহু প্রতীক্ষার পর সেই বিরতি ভেঙে জাতীয় দলের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন ফরাসি কিংবদন্তি।
"ফ্রান্সের কোচ হওয়া আমার জন্য সবচেয়ে বড় সম্মান"
দায়িত্ব গ্রহণের পর আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় জিদান বলেন,
"আমি অনেকবারই বলেছি, ফ্রান্স জাতীয় দলের চেয়ে বড় আর কিছু নেই। তাই জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়া আমার জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি বিশাল গর্বের বিষয়।"
তিনি আরও বলেন,
"এটি শুধু সম্মানের নয়, একই সঙ্গে অনেক বড় দায়িত্বও। ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট, নির্বাহী কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। জাতীয় দলকে নিয়ে আমার অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে এবং আমি সেই লক্ষ্য পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।"
বহু প্রস্তাব ফিরিয়ে জাতীয় দলকে বেছে নিলেন
রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পর ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় ক্লাব এবং বিভিন্ন জাতীয় দল থেকে কোচিংয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন জিদান। তবে তিনি সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি জানান, ফ্রান্স জাতীয় দলের দায়িত্ব পাওয়ার আশাতেই তিনি দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন। তাঁর কাছে জাতীয় দলের কোচ হওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
এই সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট যে, ক্লাব ফুটবলের সাফল্যের পর এবার আন্তর্জাতিক ফুটবলেও নিজের কোচিং দর্শনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে চান তিনি।
দেশমের উত্তরসূরি হিসেবে বড় চ্যালেঞ্জ
দিদিয়ের দেশম ফ্রান্সের ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচ। তাঁর অধীনে ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ এবং ২০২১ সালে উয়েফা নেশনস লিগ জিতেছিল ফ্রান্স। এছাড়া ২০২২ ও ২০২৬—দুই বিশ্বকাপেই দলকে শেষ চারে তুলেছিলেন তিনি।
এমন সফল একজন কোচের স্থলাভিষিক্ত হওয়ায় জিদানের সামনে বড় প্রত্যাশা থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—
নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন।
বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা।
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও ২০৩০ বিশ্বকাপের জন্য শক্তিশালী পরিকল্পনা তৈরি।
দলের আক্রমণভাগ ও মিডফিল্ডে নতুন কৌশল প্রয়োগ।
কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত
রিয়াল মাদ্রিদে দায়িত্ব পালনকালে জিদানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল খেলোয়াড়দের সঠিকভাবে ব্যবহার এবং বড় ম্যাচে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া।
ফ্রান্স জাতীয় দলেও তিনি অভিজ্ঞ ও তরুণ ফুটবলারদের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড গঠনের চেষ্টা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর অধীনে ফ্রান্সের খেলায় আরও বেশি বল দখল, দ্রুত আক্রমণ এবং কৌশলগত নমনীয়তা দেখা যেতে পারে।
নেশনস লিগ দিয়েই শুরু হতে পারে নতুন যাত্রা
ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশনের সূচি অনুযায়ী, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর উয়েফা নেশনস লিগে তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই শুরু হতে পারে জিদানের কোচিং অধ্যায়।
এই ম্যাচকে ঘিরেই শুরু হবে নতুন যুগের পরীক্ষা। সমর্থকদের প্রত্যাশা থাকবে, বিশ্বকাপ ব্যর্থতার হতাশা কাটিয়ে নতুন উদ্যমে ফিরবে ফরাসি ফুটবল।
বিশ্ব ফুটবলে বড় বার্তা
জিদানের জাতীয় দলে ফেরা শুধু ফ্রান্সের জন্য নয়, বিশ্ব ফুটবলের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জয়, কোচ হিসেবে ইউরোপ শাসন এবং এখন জাতীয় দলের দায়িত্ব—এই তিনটি অধ্যায় তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স যদি আগামী কয়েক বছরে আবারও বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতে, তবে কোচ হিসেবেও জিদানের কিংবদন্তি মর্যাদা আরও উঁচুতে পৌঁছাবে।
সংক্ষেপে মূল তথ্য
নতুন কোচ: জিনেদিন জিদান
চুক্তির মেয়াদ: ২০৩০ সাল পর্যন্ত
পূর্বসূরি: দিদিয়ের দেশম
প্রথম সম্ভাব্য ম্যাচ: ২৫ সেপ্টেম্বর, উয়েফা নেশনস লিগে তুরস্কের বিপক্ষে
বিশেষ অর্জন: খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয়, কোচ হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদকে টানা তিনটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা
জিদানের নিয়োগের মাধ্যমে ফ্রান্স ফুটবল নতুন এক স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু করল। এখন দেখার বিষয়, ক্লাব ফুটবলে অসাধারণ সফল এই কোচ জাতীয় দলকেও কি আবার বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ফিরিয়ে নিতে পারেন।


0 মন্তব্যসমূহ