পেরিমেনোপজে কেন বদলে যায় ত্বক? শুষ্কতা, ব্রণ ও সংবেদনশীলতার পেছনের কারণ জানালেন বিশেষজ্ঞরা
মেনোপজের আগেই শুরু হতে পারে ত্বকের বড় পরিবর্তন; আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সঠিক পরিচর্যা ও সচেতনতা
লাইফস্টাইল ডেস্ক | পকেট নিউজ
হঠাৎ করেই ত্বক আগের মতো থাকে না। ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের পরও শুষ্কতা কমে না, দীর্ঘদিনের পরিচিত স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহার করলেও জ্বালাপোড়া শুরু হয়, এমনকি বহু বছর পর আবার ব্রণের সমস্যাও দেখা দেয়। অনেক নারীই এসব পরিবর্তনকে বয়স, মানসিক চাপ কিংবা আবহাওয়ার প্রভাব ভেবে এড়িয়ে যান। অথচ চিকিৎসকদের মতে, এর পেছনে থাকতে পারে পেরিমেনোপজ—যা মেনোপজের আগে নারীদের শরীরে শুরু হওয়া একটি স্বাভাবিক হরমোনগত পরিবর্তনের ধাপ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেরিমেনোপজ কোনো রোগ নয়; বরং নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক জৈবিক অধ্যায়। তবে এ সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের ওঠানামার কারণে ত্বকসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। সঠিক সময়ে বিষয়টি বুঝতে পারলে এবং প্রয়োজনীয় যত্ন নিলে এসব পরিবর্তনের প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
কী এই পেরিমেনোপজ?
পেরিমেনোপজ হলো মেনোপজের আগের সময়কাল, যখন শরীরে ধীরে ধীরে হরমোনের ভারসাম্যে পরিবর্তন শুরু হয়। সাধারণত মেনোপজের দুই থেকে দশ বছর আগে এই পর্যায় শুরু হতে পারে। অনেক নারীর ক্ষেত্রে ত্রিশের শেষ দিক থেকেই এর লক্ষণ দেখা দিলেও সচেতনতার অভাবে বিষয়টি অনেক সময় ধরা পড়ে না।
চিকিৎসকদের মতে, এই সময় হরমোনের ওঠানামা শুধু মাসিক চক্রেই প্রভাব ফেলে না, বরং ত্বক, চুল, ঘুম, মানসিক অবস্থা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।
কেন বদলে যায় ত্বক?
ত্বকের স্বাস্থ্য অনেকটাই নির্ভর করে ইস্ট্রোজেন হরমোনের ওপর। এই হরমোন কমতে শুরু করলে ত্বকের কোলাজেন উৎপাদন, আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা এবং প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফলে এক সপ্তাহ ত্বক অতিরিক্ত তৈলাক্ত থাকলেও পরের সপ্তাহেই তা অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। অনেকের ত্বক আগের তুলনায় দ্রুত বয়সের ছাপও প্রকাশ করতে শুরু করে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি কল্পনা নয় কিংবা শুধুই বয়সের ছাপও নয়; বরং শরীরের ভেতরে চলতে থাকা হরমোনগত পরিবর্তনেরই বহিঃপ্রকাশ।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
অতিরিক্ত শুষ্কতা
পেরিমেনোপজের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলোর একটি হলো ত্বকের অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যাওয়া। নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের পরও ত্বক টানটান ও রুক্ষ অনুভূত হতে পারে। কারণ, এ সময় হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ও সিরামাইডের স্বাভাবিক উৎপাদন কমে যায়।
হঠাৎ সংবেদনশীল হয়ে যাওয়া
বছরের পর বছর ব্যবহার করা প্রসাধনীও হঠাৎ অস্বস্তি, জ্বালাপোড়া বা লালচে ভাব সৃষ্টি করতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে সূর্যের আলোয় বের হলেই ত্বকে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে নতুন করে ব্রণ
যাদের বহু বছর ধরে ব্রণের সমস্যা ছিল না, তাদেরও চোয়াল, থুতনি কিংবা গলার আশপাশে ব্যথাযুক্ত ব্রণ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, এটি হরমোনের পরিবর্তনের স্বাভাবিক ফল।
অস্বাভাবিক চুলকানি
কিছু নারীর ক্ষেত্রে ত্বকে তীব্র চুলকানি কিংবা পোকা হাঁটার মতো অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে, যা দৈনন্দিন জীবনে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সব শুষ্ক ত্বকই কি পেরিমেনোপজের লক্ষণ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি এমন নয়। একজিমা, থাইরয়েডের সমস্যা, অ্যালার্জি কিংবা অন্যান্য শারীরিক জটিলতার কারণেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
তাই শুধু নিজে অনুমান করে চিকিৎসা শুরু না করে ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শও নিতে হতে পারে।
ত্বকের যত্নে কী করবেন?
পেরিমেনোপজের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী রাখা।
সকালে
মৃদু ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন।
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সিরাম ব্যবহার করুন।
ত্বকের ধরন অনুযায়ী ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
চোখের চারপাশে আই ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন।
প্রতিদিন অবশ্যই ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।
রাতে
ভালোভাবে মুখ পরিষ্কার করুন।
সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন হালকা এক্সফোলিয়েশন করুন।
চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজন হলে মৃদু রেটিনয়েড ব্যবহার করতে পারেন।
শেষে সমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
যেসব উপাদান উপকারী
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়ে ত্বকের জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
সিরামাইড
হায়ালুরোনিক অ্যাসিড
পেপটাইড
গ্লিসারিন
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
রেটিনয়েড
এসব উপাদান ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে, কোলাজেন উৎপাদনে সহায়তা করতে এবং ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে।
যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
পেরিমেনোপজের সময় ত্বক তুলনামূলক সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। তাই কয়েকটি সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
একসঙ্গে অনেক সক্রিয় স্কিনকেয়ার উপাদান ব্যবহার করবেন না।
অতিরিক্ত স্ক্রাব বা এক্সফোলিয়েশন থেকে বিরত থাকুন।
ঘন ঘন স্কিনকেয়ার পণ্য পরিবর্তন করবেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ট্রেন্ড দেখে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নতুন পণ্য ব্যবহার করবেন না।
সবার ক্ষেত্রে কি একই রকম প্রভাব পড়ে?
চিকিৎসকদের মতে, হরমোনগত পরিবর্তন সব নারীর জীবনেই আসে। তবে এর প্রভাব সবার ক্ষেত্রে একরকম হয় না।
বংশগত বৈশিষ্ট্য, সূর্যের অতিরিক্ত সংস্পর্শ, ধূমপান, মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং জীবনযাপনের ধরন—এসব বিষয় ত্বকের পরিবর্তনের মাত্রা বাড়াতে বা কমাতে পারে।
আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেরিমেনোপজকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। এটি নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক অধ্যায়। ত্বকে পরিবর্তন দেখা দিলেই আতঙ্কিত না হয়ে তার কারণ বোঝা এবং সময়মতো সঠিক পরিচর্যা শুরু করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক স্কিনকেয়ার রুটিন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাদ্য এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করলে ত্বক ধীরে ধীরে এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ