ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলা: দুই রাতে ১৭০ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পকেট নিউজ|৯ জুলাই ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে আবারও ভয়াবহ সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ কার্যত ভেঙে যাওয়ার পর টানা দ্বিতীয় রাতেও ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, গত ৪৮ ঘণ্টায় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ১৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। এর জবাবে বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনাই নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় হামলা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা।
সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের নৌঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো, সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য কৌশলগত স্থাপনাকে লক্ষ্য করেই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
এটি গত জুনে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত সমঝোতার পর সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরানের দাবি: নিহত ১৪, আহত ৭৮
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৭ ও ৮ জুলাই চালানো মার্কিন হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল দেশের পাঁচটি প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
রেলপথ ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হামলায় তেহরানের সঙ্গে সংযুক্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি তেহরানমুখী রেল করিডরের কিছু অংশও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের বুশেহর এলাকায় পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি বিস্ফোরণের খবরও পাওয়া গেছে। যদিও ওই স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ট্রাম্পের কড়া বার্তা
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিকে কার্যত সমাপ্ত ঘোষণা করেন।
হামলার পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ তিনি লেখেন,
“এটি জাহাজে ইরানের হামলার প্রতিশোধ। যদি তারা আবার এমন কিছু করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।”
ট্রাম্প একই সঙ্গে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে যেতে চায় না; তবে প্রয়োজন হলে কঠোর জবাব দিতে প্রস্তুত।
পাল্টা হামলায় ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের পরপরই ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
ইরানি বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু ছিল—
বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর,
কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি,
কাতারে মার্কিন সামরিক স্থাপনা।
হামলার সতর্কতায় বাহরাইনে একাধিকবার সাইরেন বাজানো হয়। একই সময়ে জর্ডানও জানায়, তারা নিজেদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করেই বর্তমান উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।
বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, সমুদ্রবাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করছে।
যদি পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং আন্তর্জাতিক নৌপথকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সারসংক্ষেপ
দুই রাতের মধ্যে ১৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং এর জবাবে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা ভেঙে পড়ায় কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান উদ্বেগ—এই সংঘাত যেন পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ না নেয় এবং বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা নতুন সংকটে না পড়ে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও আল-জাজিরা।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ