ইউরোপে গুগলকে ১০০ কোটি ডলার জরিমানা: প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে নতুন চাপ, ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা
ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট (DMA) লঙ্ঘনের অভিযোগে গুগলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নের। সার্চ ফলাফলে নিজেদের সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, গুগল প্লে স্টোরে প্রতিযোগিতা সীমিত করা এবং বাজারে আধিপত্যের অপব্যবহারের অভিযোগে ১০০ কোটি ডলারের জরিমানা। এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ বাণিজ্য সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬
তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
বিশ্বের বৃহত্তম সার্চ ইঞ্জিন গুগলকে ১০০ কোটি ডলার জরিমানা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সার্চ ইঞ্জিনে নিজেদের বাজারক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতিযোগীদের সেবাকে পিছিয়ে দেওয়া এবং ডিজিটাল বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে বৃহস্পতিবার এ জরিমানার ঘোষণা দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি আর্থিক জরিমানা নয়; বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর নিয়ন্ত্রণ নীতির আরেকটি বড় উদাহরণ। একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক উত্তেজনাকেও আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
কেন জরিমানা করা হলো?
ইউরোপীয় কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে গুগল তাদের প্রভাব ব্যবহার করে নিজেদের বিভিন্ন সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন শপিং, ভ্রমণ, গেমিং এবং অনুবাদসেবার ক্ষেত্রে গুগলের নিজস্ব প্ল্যাটফর্মগুলো সার্চ ফলাফলে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে, একই ধরনের সেবা দেওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট ও প্ল্যাটফর্মগুলোকে তুলনামূলকভাবে নিচের অবস্থানে দেখানো হয়েছে। কমিশনের মতে, এ ধরনের কার্যক্রম মুক্ত প্রতিযোগিতার নীতির পরিপন্থী এবং ব্যবহারকারীদের জন্য বিকল্প সেবা বেছে নেওয়ার সুযোগ সীমিত করে।
গুগল প্লে স্টোর নিয়েও অভিযোগ
শুধু সার্চ ইঞ্জিন নয়, গুগল প্লে স্টোর পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছে ইউরোপীয় কমিশন।
তদন্তে বলা হয়েছে, গুগল এমন কিছু নীতিমালা কার্যকর রেখেছিল যার কারণে অ্যাপ নির্মাতারা ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে কিংবা গুগলের বাইরে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন করতে পারতেন না।
এর ফলে ডেভেলপারদের গুগলের কমিশননির্ভর ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়েছে, যা প্রতিযোগিতা সীমিত করেছে এবং বাজারে গুগলের প্রভাব আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করছে কমিশন।
ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘনের অভিযোগ
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভাষ্য অনুযায়ী, গুগল ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট (DMA) লঙ্ঘন করেছে।
২০২২ সালে কার্যকর হওয়া এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন নিজেদের একাধিক সেবাকে ব্যবহার করে বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য সৃষ্টি করতে না পারে এবং প্রতিযোগীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
ইইউ মনে করে, সার্চ, স্মার্টফোন, ই-কমার্স এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো খাতে কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে যে তারা কার্যত পুরো ডিজিটাল বাজারের ‘গেটকিপার’ বা নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে।
কমিশনের বার্তা
ইউরোপীয় কমিশনের প্রতিযোগিতা নীতিবিষয়ক নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট তেরেসা রিবেরা বলেছেন, একটি পণ্য সফল হবে তার গুণগত মানের কারণে—কোনো সার্চ ইঞ্জিনের মালিকানাগত সুবিধার কারণে নয়।
তার ভাষায়, ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্টের লক্ষ্য হলো ডিজিটাল বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা, উদ্ভাবন এবং ভোক্তাদের জন্য অধিক বিকল্প নিশ্চিত করা।
৬০ দিনের আল্টিমেটাম
শুধু জরিমানা দিয়েই থেমে থাকেনি ইউরোপীয় কমিশন।
গুগলকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে সার্চ ফলাফলে প্রতিদ্বন্দ্বী সেবাগুলোকে আরও দৃশ্যমান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হলে প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক আয়ের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত জরিমানা আরোপ করা হতে পারে।
গুগলের প্রতিক্রিয়া
গুগলের প্রধান আইন কর্মকর্তা কেন্ট ওয়াকার কমিশনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
তার দাবি, এই সিদ্ধান্তের কারণে গুগলকে তাদের বিভিন্ন পণ্যের নকশা পরিবর্তন করতে হবে, যা শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ব্যবহারকারীদের জন্য সেবার মান কমিয়ে দেবে।
তিনি বলেন, প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে এ ধরনের সিদ্ধান্ত উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং উন্নত প্রযুক্তি সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
গুগলের আর্থিক অবস্থার ওপর কতটা প্রভাব?
যদিও ১০০ কোটি ডলারের জরিমানা একটি বিশাল অঙ্ক, তবুও গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফল বিবেচনায় এটি তুলনামূলকভাবে সীমিত প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সম্প্রতি অ্যালফাবেট জানিয়েছে, স্পেসএক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকে বিনিয়োগ থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়ায় তাদের ত্রৈমাসিক মুনাফা বেড়ে ১১২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া নিয়ে জল্পনা
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের বিষয় বিবেচনা করছেন।
ট্রাম্প এর আগেও অভিযোগ করেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইচ্ছাকৃতভাবে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে বড় অঙ্কের জরিমানা করছে।
হোয়াইট হাউসের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া এখন ব্রাসেলসের কর্মকর্তাদের বিশেষ নজরে রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই জরিমানা যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরেই নজরদারিতে গুগল
গুগল নতুন করে প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় তদন্তের মুখোমুখি হয়নি।
২০১৭ সালের পর থেকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা-বিষয়ক মামলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন গুগলের বিরুদ্ধে একাধিকবার ব্যবস্থা নিয়েছে। ইতোমধ্যে কোম্পানিটিকে ১০০ কোটিরও বেশি ইউরো জরিমানা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রেও গুগলের বিরুদ্ধে একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগে ঐতিহাসিক মামলা হয়েছে। সেই মামলায় আদালত গুগলকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নির্দিষ্ট তথ্য ও সার্চ-সম্পর্কিত সুবিধা ভাগাভাগি করার নির্দেশ দেয়।
শুধু গুগল নয়, অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও নজরদারিতে
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর নজরদারির আওতায় শুধু গুগল নয়, বিশ্বের অন্যান্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
সম্প্রতি গুগলকে অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে প্রতিদ্বন্দ্বী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সেবার প্রবেশে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে মেটাকে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নকশায় পরিবর্তন আনতে বলা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীরা প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত আসক্ত না হয়ে পড়েন।
অন্যদিকে, চীনা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলিএক্সপ্রেসকে অনিরাপদ ও নকল পণ্য বিক্রির অভিযোগে শত কোটি ডলারের জরিমানা করা হয়েছে। টিকটককেও ব্যবহারকারীদের আসক্তি কমাতে অ্যালগরিদম ও প্ল্যাটফর্ম পরিচালনায় পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
বিশ্লেষণ
গুগলের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বশেষ পদক্ষেপ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে ব্রাসেলস আগের চেয়ে আরও কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
একদিকে ইউরোপ ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি—এ ধরনের পদক্ষেপ মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বৈষম্যমূলক।
ফলে এই জরিমানা শুধু একটি প্রতিযোগিতা আইন প্রয়োগের ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ বাণিজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে।


0 মন্তব্যসমূহ