ইরানের বিরুদ্ধে আবারও নৌ অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের নতুন অধ্যায়ের আশঙ্কা
২০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ ও শতাধিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন; ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারিতে বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পকেট নিউজ|১৫ জুলাই ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতা, যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক আলোচনার পর আবারও ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ কার্যকর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ওয়াশিংটন সময় মঙ্গলবার বিকেল ৪টা থেকে ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় অঞ্চল ঘিরে নতুন করে অবরোধ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং শতাধিক যুদ্ধবিমান অভিযান পরিচালনা করছে। ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপ শুধু ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
কেন আবার নৌ অবরোধ?
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক চরম উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে।
ওই হামলার জবাবে ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে এই জলপথে যেকোনো সামরিক সংঘাত আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় নৌ অবরোধ আরোপ করে। কয়েক মাস পর দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলে জুন মাসে সেই অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
কিন্তু যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হয়নি।
যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন সংঘাত
সমঝোতা কার্যকর হওয়ার পরও দুই দেশের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ওয়াশিংটন অভিযোগ করে, ইরান চুক্তির বিভিন্ন শর্ত লঙ্ঘন করেছে। অন্যদিকে তেহরান দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম সমঝোতা ভঙ্গ করেছে।
এই পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি বাতিল ঘোষণা করেন।
এরপরই তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় নৌ অবরোধ কার্যকর করার নির্দেশ দেন।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই অবরোধের উদ্দেশ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তির ব্যাপক উপস্থিতি
নৌ অবরোধের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতিও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে—
২০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ
শতাধিক যুদ্ধবিমান
বিভিন্ন গোয়েন্দা নজরদারি বিমান
ড্রোন ইউনিট
নৌ ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন রয়েছে।
সেন্টকম বলেছে, "মার্কিন বাহিনী সর্বদা সতর্ক, লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত এবং যেকোনো হুমকির জবাব দিতে সক্ষম।"
টানা চতুর্থ রাতের হামলা
নৌ অবরোধ ঘোষণার পাশাপাশি ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে টানা চতুর্থ রাতের মতো হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, এসব হামলার মূল লক্ষ্য ছিল—
নৌঘাঁটি
ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা
সামরিক গুদাম
ড্রোন পরিচালনা কেন্দ্র
হরমুজ প্রণালিতে হামলা চালানোর সক্ষমতা
ওয়াশিংটনের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
ট্রাম্পের কড়া বার্তা
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নতুন করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে একই সঙ্গে কঠোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, যদি তেহরান আলোচনায় না ফেরে, তাহলে আগামী সপ্তাহেই ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং অন্যান্য কৌশলগত স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালানো হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং সামরিক অভিযানের পূর্বাভাসও হতে পারে।
পাল্টা হামলার দাবি ইরানের
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা জর্ডানের আজরাক ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এ ছাড়া ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে—
বাহরাইনে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার
কুয়েতে সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণাগার
লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং এ বিষয়ে পেন্টাগনও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হরমুজ প্রণালি।
প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে।
ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এতে জড়িয়ে পড়তে পারে—
ইসরায়েল
উপসাগরীয় আরব দেশগুলো
যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি
আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য
ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?
বর্তমানে কূটনৈতিক আলোচনা কার্যত স্থবির।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হামলার সক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করছে।
এ অবস্থায় নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যেকোনো সামরিক সংঘর্ষ বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এখন শুধু দুই দেশের দ্বন্দ্ব নয়; বরং এটি বিশ্ব নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ