রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, আগামী মাসেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ
চূড়ান্ত পরীক্ষার পর ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য; বাণিজ্যিক উৎপাদনে এখনো নিরাপত্তা যাচাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
নিজস্ব প্রতিবেদক| পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন প্রবেশ করেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পর্যায়ে। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময়ের পরিকল্পনা, নির্মাণ ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির পর আগামী মাসে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি চলছে। তবে উৎপাদনের আগে প্রতিটি ধাপের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA)।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পরীক্ষামূলক উৎপাদন সফল হলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধাপেই তাড়াহুড়া করা হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা স্পষ্ট জানিয়েছেন।
শেষ পর্যায়ে চুল্লি পরীক্ষার কাজ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রূপপুর প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে ১২ মে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে চলছে একাধিক প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা পরীক্ষা।
সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হলে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজন (Controlled Nuclear Fission) শুরু হবে। এই বিভাজন থেকে উৎপন্ন তাপে বাষ্প তৈরি হবে, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।
এটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ধাপগুলোর একটি। তাই প্রতিটি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
২ হাজারের বেশি পরীক্ষা ইতোমধ্যে সম্পন্ন
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নিরাপত্তা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে—
প্রথম ধাপে ২,০৪৬টি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে ৯০টি পরীক্ষা শেষ হয়েছে।
বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপের আরও ১৮টি জটিল পরীক্ষা বাকি রয়েছে।
প্রতিটি ধাপ শেষে পরীক্ষার তথ্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করছে। প্রয়োজন হলে সংশোধন করে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
আগামী মাসে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী মাসে প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতে পারে।
তবে এটি পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন নয়। পরীক্ষামূলক উৎপাদনের সময়ও বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত পর্যবেক্ষণ চলবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরীক্ষামূলক উৎপাদন টানা সাত থেকে আট মাস পর্যন্ত চলতে পারে। এরপর সব পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফল মিললে আগামী বছর একটি ইউনিট থেকে পূর্ণ ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
ডিসেম্বরে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পরিকল্পনা, তবে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে
রূপপুর কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৃতি বিবেচনায় নির্ধারিত সময়সীমা কিছুটা পিছিয়ে যেতে পারে।
কারণ, প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী যাচাই না করে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ নেই।
নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সংবেদনশীল।
তিনি জানান, প্রতিটি পরীক্ষা শেষে ফলাফল বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে সংশোধন করে তবেই পরবর্তী ধাপে যাওয়া হচ্ছে। তাই আগেভাগে নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা বাস্তবসম্মত নয়।
রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত দুই ইউনিট
পাবনার রূপপুরে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট দুটি ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ইউনিট নির্মাণ করছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)।
দুই ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট।
পারমাণবিক জ্বালানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি প্রতি দেড় বছর পরপর পরিবর্তন করতে হবে।
জ্বালানি পরিবর্তন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহৃত জ্বালানি অপসারণের জন্য একটি ইউনিট সর্বোচ্চ দুই মাস বন্ধ থাকতে পারে।
ব্যবহৃত জ্বালানিতে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়তা থাকায় সেটি বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হবে।
বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ব্যবহৃত জ্বালানি পরবর্তীতে রাশিয়ায় পাঠানো হবে। সেখানে তা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুযায়ী স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হবে।
যদিও বর্জ্য পরিবহনের বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা
রূপপুরে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান টিভিএল (TVEL)।
প্রথম তিন বছরের জ্বালানি ইতোমধ্যে চুক্তির আওতায় সরবরাহ করা হয়েছে। এরপর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করবে প্রতিষ্ঠানটি।
চুক্তিতে জ্বালানির নির্দিষ্ট মূল্য উল্লেখ না থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারদরের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণের একটি সূত্র রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে একটি সর্বোচ্চ মূল্যসীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা
রূপপুর প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
পরবর্তীতে সময়সীমা কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
যদিও ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ ছিল না, তবে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
এখনো চূড়ান্ত হয়নি বিদ্যুতের দাম
রূপপুর থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট মূল্য এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণ করা হবে।
তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, নির্মাণ ব্যয় বেশি হলেও পারমাণবিক জ্বালানির খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে এই বিদ্যুতের দাম অন্যান্য আমদানিনির্ভর জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক হবে।
গ্রিড প্রস্তুত, তবে স্পিনিং রিজার্ভ নিয়ে উদ্বেগ
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি জানিয়েছে, রূপপুরের বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য জাতীয় গ্রিড পুরোপুরি প্রস্তুত।
তবে বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা স্পিনিং রিজার্ভ নিয়ে কিছু উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
স্পিনিং রিজার্ভ হলো এমন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, যা জরুরি মুহূর্তে তাৎক্ষণিকভাবে চালু করা যায়। যদি কোনো কারণে রূপপুরের উৎপাদন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এই রিজার্ভই গ্রিডকে স্থিতিশীল রাখবে।
বর্তমানে গ্যাস সংকটের কারণে পর্যাপ্ত স্পিনিং রিজার্ভ নিশ্চিত করা কিছুটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম মনে করেন, রূপপুর এখন সবচেয়ে সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে।
তাঁর ভাষায়, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো ধরনের তাড়াহুড়া গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি পরীক্ষায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করার পরই বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে হবে। একটি পরীক্ষাতেও সমস্যা ধরা পড়লে সময়সূচি পিছিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন যুগের সূচনা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং শিল্পায়নের ভবিষ্যতের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়ন দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনবে, আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রেখে প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করা এবং পরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস না করা।


0 মন্তব্যসমূহ