বাংলাদেশে পোশাকের নতুন ক্রয়াদেশ স্থগিত করল পোল্যান্ডের এলপিপি: ৪ কোটি ডলারের বকেয়া নিয়ে সংকটে রপ্তানি খাত
বাণিজ্য ডেস্ক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নতুন করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ফ্যাশন ব্র্যান্ড পোল্যান্ডভিত্তিক এলপিপি (LPP) বাংলাদেশ থেকে নতুন পোশাকের ক্রয়াদেশ এবং নতুন পণ্য উন্নয়নের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। রাশিয়ার ক্রেতা এফইএস রিটেইল (FES Retail)–এর কাছে বাংলাদেশি পোশাক প্রস্তুতকারক ও বায়িং হাউসগুলোর প্রায় ৪ কোটি মার্কিন ডলার বকেয়া অর্থকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধের জেরেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিষয়টি শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, রপ্তানি প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ বিদেশি ক্রয়াদেশের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বকেয়া অর্থ পরিশোধ নিয়ে জটিলতার শুরু
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার বাজারে ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতার মুখে পড়ে এলপিপি। তখন প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার এফইএস রিটেইল–এর মাধ্যমে বাংলাদেশি পোশাক কারখানা ও বায়িং হাউসগুলোকে ক্রয়াদেশ দেওয়া শুরু করে।
রপ্তানিকারকদের দাবি, এই ক্রয়াদেশগুলো এলপিপির নিশ্চয়তা ও সমন্বয়ের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়েছিল। শুরুতে অর্থ পরিশোধ স্বাভাবিক থাকলেও গত বছর থেকে পণ্য সরবরাহের পরও বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে যায়।
বর্তমানে কয়েকটি পোশাক কারখানা ও বায়িং হাউসের মোট পাওনা প্রায় ৪ কোটি মার্কিন ডলার, যার একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী রয়েছে।
এলপিপির অবস্থান
এলপিপি বলছে, অর্থ পরিশোধের জন্য তারা চুক্তিগতভাবে দায়ী নয়। যদিও প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে যে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন বৈঠক ও আলোচনায় তারা অংশ নিয়েছে এবং মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে।
গত ২১ জুলাই বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিজিবিএকে পাঠানো এক চিঠিতে এলপিপি জানায়, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তারা ধীরে ধীরে বাংলাদেশে তাদের সোর্সিং কার্যক্রম কমাবে।
পরবর্তীতে ৩০ জুলাই সরবরাহকারীদের পাঠানো আরেকটি চিঠিতে জানানো হয়—
নতুন ক্রয়াদেশ আপাতত বন্ধ থাকবে।
নতুন পণ্য উন্নয়নের কাজও স্থগিত থাকবে।
অন্যান্য দেশে উৎপাদন ও সোর্সিংয়ের বিকল্প মূল্যায়ন করা হবে।
তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিতও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশের শিল্পমালিকদের অভিযোগ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা এলপিপির অবস্থানকে দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন।
গার্মেন্ট বায়িং হাউস মালিকদের সংগঠন বিজিবিএ জানিয়েছে, তাদের সদস্যভুক্ত ৯টি প্রতিষ্ঠানেরই প্রায় ৪৫ লাখ ডলার পাওনা রয়েছে।
সংগঠনটির দাবি—
এফইএস রিটেইলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল এলপিপির কর্মকর্তারাই।
এলপিপির অফিস থেকেই ক্রয়াদেশ দেওয়া হতো।
অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তাও এলপিপি দিয়েছিল।
এখন সেই দায় অস্বীকার করায় বাংলাদেশের সরবরাহকারীরা বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছেন।
আদালতের দ্বারস্থ সরবরাহকারীরা
বকেয়া অর্থ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে।
এর মধ্যে এনসা ক্লোথিং গত বছরের এপ্রিলে এফইএস রিটেইলের জন্য প্রায় ৫২ হাজার ডলারের ট্রাউজার রপ্তানি করে। পণ্যটি রাশিয়ার বন্দরে পৌঁছালেও অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় এখনো তা বন্দরে আটকে রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এলপিপি আগের কিছু চালানের অর্থ পরিশোধ করলেও পরবর্তী চালানের ক্ষেত্রে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
বিকেএমইএর কঠোর অবস্থান
পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)।
সংগঠনটির সর্বশেষ পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে—
এলপিপি বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করলে প্রতিষ্ঠানটিকে কালোতালিকাভুক্ত করা হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ফোরামে অভিযোগ জানানো হবে।
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরা হবে।
শিল্পমালিকদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বেন।
অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা হতে পারে?
বাংলাদেশ থেকে এলপিপি বছরে প্রায় ৮০ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক সংগ্রহ করে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
যদি প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদে ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেয় বা অন্য দেশে সরিয়ে নেয়, তাহলে—
রপ্তানি আয় কমতে পারে,
কারখানাগুলোর উৎপাদন কমে যেতে পারে,
কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি হতে পারে,
ছোট ও মাঝারি বায়িং হাউসগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার এই সময়ে এমন সংকট বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য বড় সতর্কবার্তা।
কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমাধানের প্রয়োজন
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু দুই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিরোধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে দায়বদ্ধতা ও বাণিজ্যিক আস্থার প্রশ্নও জড়িত।
তাঁদের মতে—
ক্রয়াদেশের গ্যারান্টি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের দায় স্পষ্ট করতে হবে,
আন্তর্জাতিক সালিশ বা বাণিজ্যিক মধ্যস্থতার পথ খোলা রাখা প্রয়োজন,
সরকার, রপ্তানিকারক সংগঠন এবং বিদেশি ক্রেতাদের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত সমাধান না হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশের পোশাক খাত বর্তমানে এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যেখানে কয়েক কোটি ডলারের বকেয়া অর্থ, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের দায়বদ্ধতা এবং রপ্তানিকারকদের আস্থার প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে এসেছে। এলপিপির নতুন ক্রয়াদেশ স্থগিতের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বকেয়া অর্থ দ্রুত নিষ্পত্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতের প্রতি বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থা অটুট রাখা।


0 মন্তব্যসমূহ