‘হাসিনা কার্ড’ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক একসঙ্গে চলতে পারে না: দিল্লিকে সালাহউদ্দিন
রাজনীতি ডেস্ক, পকেট নিউজ | ৮ আগস্ট ২০২৬
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে ভারতকে সতর্ক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ভারত যদি বাংলাদেশের গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশটির মাটিতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেয়, তাহলে একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে দিল্লিকে।
শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা হাসিনা কার্ড খেলবেন আর বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইবেন; মনে রাখতে হবে, দুটো বিপরীত।’ ভারতের কর্তৃপক্ষ ও সরকার বিষয়টি উপলব্ধি করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ভারতের প্রতি বার্তা
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে দুই দেশের সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।
তিনি ভারতের প্রতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে সমর্থন না দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা চায় না; বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। তবে সেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ বা ক্ষমতাচ্যুত কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বকে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হলে তার প্রভাব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পড়তে পারে।
‘গণ–অভ্যুত্থান শুধু ৩৬ দিনের ঘটনা নয়’
আলোচনা সভায় জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ইতিহাস নিয়েও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনকে শুধু ৩৬ দিনের ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে দেখলে এর দীর্ঘ রাজনৈতিক পটভূমি ও ত্যাগের ইতিহাসকে উপেক্ষা করা হবে।
তাঁর ভাষায়, গণ–অভ্যুত্থান হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম, নির্যাতন ও ত্যাগ রয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা ও পরিপক্বতার কোনো বিকল্প নেই। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সংগ্রামকে অস্বীকার করে কেবল সাম্প্রতিক সময়ের আন্দোলনকে সব অর্জনের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে দেখাকে তিনি বাস্তবসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ৩৬ দিনের আন্দোলনের আগে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও সাধারণ মানুষ বিভিন্নভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। সেই ধারাবাহিকতাকে বাদ দিলে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পূর্ণ ইতিহাস পাওয়া যাবে না।
সহিংসতা নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের আহ্বান
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ষড়যন্ত্র ও উসকানিতে পা না দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কোনো ধরনের উসকানিতে পা না দিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ জানাতে হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গালি বা অপপ্রচারের জবাব গালি বা সহিংসতার মাধ্যমে দেওয়া উচিত নয়। বরং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই এর জবাব দিতে হবে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মতের পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সহিংসতায় জড়ানো যাবে না।
সংবিধান সংস্কারে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের আহ্বান
সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার-প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ না করার সমালোচনা করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য এমন একটি সংবিধান প্রয়োজন, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতা জরুরি।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর সাংবিধানিক সংস্কার প্রয়োজন।
‘জুলাইয়ের কৃতিত্ব কোনো একক পক্ষের নয়’
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নেওয়ার বিরোধিতা করেন।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ছিল দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক সংগ্রাম। সেই আন্দোলনে ছাত্র–জনতার পাশাপাশি বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অংশ নিয়েছেন।
রিজভীর দাবি, জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিএনপির পূর্ণ সমর্থন ছিল। ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ ও ‘বাংলা ব্লকেড’-এর মতো কর্মসূচিতেও দলটি ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদলের ১৪২ জন নেতা-কর্মী শহীদ হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের অর্জনকে কোনো একক পক্ষের সম্পত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই আন্দোলনের পেছনে বহু মানুষের ত্যাগ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম রয়েছে।
ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক
সভায় বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়েও বক্তব্য দেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি সম্প্রতি একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকার উপস্থাপন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
রিজভী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা যথাযথভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
তিনি একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের মানসিকতার পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর জোর দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বৈরাচারী নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আগের সরকারের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চরম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিল।
তাঁর অভিযোগ, মুক্তবুদ্ধির চর্চা বাধাগ্রস্ত করা হতো এবং সাধারণ শিক্ষকদের মতামত উপেক্ষা করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হতো। প্রতিবাদী শিক্ষকদের ওপর মানসিক ও প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং দেশের গণতান্ত্রিক সংকটের সময়ে শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে এসে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন উপাচার্য।
শহীদ পরিবারের আকুতি: ‘জুলাইকে কারও সম্পত্তি করবেন না’
অনুষ্ঠানে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে শহীদ মো. ওয়াসিম আকরামের বাবা শফিউল আলমও বক্তব্য দেন। তিনি জুলাইয়ের কৃতিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনের সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের কৃতিত্ব নিতে গিয়ে কেউ যেন এই আন্দোলনকে নিজের বা কোনো গোষ্ঠীর ‘বাবার সম্পত্তি’ হিসেবে ব্যবহার না করেন। যে বৈষম্য দূর করার জন্য তরুণেরা জীবন দিয়েছেন, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন, শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, শহীদ ইকরামুল হক সাজিদের মা মোছা. নাজমা খাতুনসহ জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সামনে সম্পর্ক ও রাজনীতির বড় পরীক্ষা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে একদিকে যেমন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার নিয়েও নতুন করে বিতর্ক সামনে এসেছে।
জুলাইয়ের আন্দোলনের কৃতিত্ব কে বা কারা দাবি করতে পারবে—এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনায় উঠে এসেছে একটি অভিন্ন প্রশ্ন: আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে বিষয়টি এখন শুধু অতীতের আন্দোলনের ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র, সাংবিধানিক সংস্কার, রাজনৈতিক সহনশীলতা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতার প্রশ্ন।
সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন যেমন গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি দেশের ভেতরে সহিংসতার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার আহ্বানও এসেছে। আর রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যে উঠে এসেছে জুলাইয়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক পটভূমি ও আন্দোলনে বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকার প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির এই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাসের ব্যাখ্যা, আন্দোলনের উত্তরাধিকার, সংবিধান সংস্কার এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক—এই চারটি বিষয় নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।


0 মন্তব্যসমূহ