বাংলা কিউআরে এবার ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে টাকা পাঠানো যাবে, চালু ১ নভেম্বর
নিজস্ব প্রতিবেদক,পকেট নিউজ | ১৩ আগস্ট ২০২৬
দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত ও সর্বজনীন করতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এত দিন ‘বাংলা কিউআর’ মূলত দোকানে কেনাকাটা কিংবা বিভিন্ন পণ্য ও সেবার বিল পরিশোধের কাজে ব্যবহৃত হলেও এবার এর আওতা বাড়ানো হচ্ছে।
নতুন ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি সরাসরি অন্য ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ওয়ালেটে টাকা পাঠাতে পারবেন বাংলা কিউআর স্ক্যান করেই। আগামী ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে এই সুবিধা আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাব নম্বর, রাউটিং নম্বর কিংবা দীর্ঘ মোবাইল নম্বর মনে রাখা বা টাইপ করার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে। একই সঙ্গে দ্রুত ও নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
৩১ অক্টোবরের মধ্যে প্রস্তুতি শেষ করতে হবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট থেকে এ বিষয়ে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) এবং পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের (পিএসও) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব মোবাইল অ্যাপে বাংলা কিউআর প্রস্তুত, স্ক্যান এবং গ্যালারি থেকে কিউআর কোডের ছবি আপলোড করার সুবিধা যুক্ত করতে হবে।
প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর ১ নভেম্বর থেকে সর্বজনীন বাংলা কিউআর লেনদেনব্যবস্থা কার্যকর হবে।
কীভাবে বাংলা কিউআরে টাকা পাঠানো যাবে?
নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ ব্যবহারকারী প্রত্যেক গ্রাহক নিজের জন্য একটি ‘পার্সোনাল বাংলা কিউআর’ পাবেন।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি তাঁর পরিচিত কাউকে টাকা পাঠাতে চান। তাঁকে আর প্রাপকের দীর্ঘ ব্যাংক হিসাব নম্বর বা মোবাইল নম্বর টাইপ করতে হবে না।
প্রাপক নিজের মোবাইল ফোনে তাঁর ব্যক্তিগত বাংলা কিউআর কোড দেখাবেন। এরপর টাকা পাঠাতে ইচ্ছুক ব্যক্তি নিজের ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ খুলে সেই কিউআর কোড স্ক্যান করবেন। প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে লেনদেন সম্পন্ন করলেই টাকা সরাসরি প্রাপকের নির্ধারিত হিসাব বা ওয়ালেটে চলে যাবে।
শুধু সরাসরি স্ক্যানের ক্ষেত্রেই নয়, দূরে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এই সুবিধা ব্যবহার করা যাবে। প্রাপক তাঁর ব্যক্তিগত বাংলা কিউআরের ছবি মেসেজ বা অন্য কোনো মাধ্যমে পাঠাতে পারবেন। প্রেরক সেই ছবি নিজের অ্যাপে আপলোড করে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন।
ভুল নম্বরে টাকা পাঠানোর ঝুঁকি কমবে
বর্তমান ডিজিটাল লেনদেনে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো ভুল অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল নম্বরে টাকা চলে যাওয়া। বিশেষ করে দীর্ঘ নম্বর হাতে টাইপ করার সময় একটি সংখ্যা ভুল হলেই অর্থ অন্য ব্যক্তির কাছে চলে যেতে পারে।
বাংলা কিউআরভিত্তিক নতুন ব্যবস্থায় এই ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কিউআর কোড স্ক্যান বা আপলোড করার পর লেনদেন সম্পন্ন করার আগে প্রাপকের নাম ও সংক্ষিপ্ত হিসাবসংক্রান্ত তথ্য স্ক্রিনে প্রদর্শিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে টাকা পাঠানোর আগে প্রাপক সঠিক ব্যক্তি কি না, তা যাচাই করার সুযোগ থাকবে।
এতে ভুল ব্যক্তির কাছে অর্থ চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমবে।
জালিয়াতি ঠেকাতে থাকছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিউআর কোডভিত্তিক প্রতারণা ও জালিয়াতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় নিরাপত্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কিউআর কোডের তথ্য পরিবর্তন বা ভুয়া কিউআর ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া ঠেকাতে এতে পাবলিক কি ইনফ্রাস্ট্রাকচার (PKI) প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সিগনেচার ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কাঠামোয় পাবলিক কি সেন্ট্রাল ট্রাস্ট স্টোরে সংরক্ষিত থাকবে। প্রতিটি লেনদেনের সময় পেমেন্ট সুইচের মাধ্যমে সেটি রিয়েল-টাইমে যাচাই করা হবে।
ফলে কোনো কিউআর কোডের তথ্য পরিবর্তন করে সেটিকে অন্য কোনো অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত করা হলে তা শনাক্ত করার সুযোগ থাকবে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা আরও জোরদার করার লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
শুধু ব্যবসায়ী নয়, সাধারণ মানুষও সুবিধা পাবেন
বাংলা কিউআরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে—এটি আর শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা এমএফএস ওয়ালেট থাকা সাধারণ ব্যক্তি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারাও এর মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন।
বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের জন্য আলাদা মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট বা জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা কমবে।
একজন ছোট দোকানদার তাঁর ব্যক্তিগত বাংলা কিউআর ব্যবহার করে ক্রেতার কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন। একইভাবে কোনো ব্যক্তি বন্ধুবান্ধব, পরিবারের সদস্য বা অন্য পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকেও কিউআর স্ক্যানের মাধ্যমে অর্থ নিতে পারবেন।
নগদ লেনদেন কমানোর নতুন সুযোগ
বাংলাদেশে নগদ অর্থের ব্যবহার এখনো ব্যাপক। দৈনন্দিন কেনাকাটা থেকে শুরু করে ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও অনেকে নগদ টাকার ওপর নির্ভর করেন।
বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে অর্থ পাঠানোর সুবিধা চালু হলে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে ছোট অঙ্কের টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হতে পারে। কাউকে টাকা দেওয়ার জন্য ব্যাংক হিসাব নম্বর বা মোবাইল নম্বর খুঁজে বের করার পরিবর্তে শুধু কিউআর স্ক্যান করেই লেনদেন করা সম্ভব হলে ডিজিটাল পেমেন্ট আরও স্বাভাবিক ও সহজ হয়ে উঠবে।
এতে একদিকে যেমন লেনদেনের সময় কমবে, অন্যদিকে নগদ অর্থ বহন ও ব্যবহারের প্রয়োজনও কমতে পারে।
ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে আরও এক ধাপ
বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে দেশে ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতির বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আসছে। বাংলা কিউআরের পরিধি ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি লেনদেনে সম্প্রসারণ সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
এর আগে বাংলা কিউআর মূলত মার্চেন্ট পেমেন্টে ব্যবহৃত হলেও নতুন ব্যবস্থায় এটি ব্যক্তি পর্যায়েও ব্যবহারযোগ্য হবে। ফলে একই কিউআর অবকাঠামোর মাধ্যমে ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, ব্যাংক ও এমএফএস ব্যবহারকারীদের মধ্যে ডিজিটাল অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যবস্থা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি নগদ অর্থনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নজর থাকবে বাস্তবায়নের ওপর
তবে নতুন ব্যবস্থার সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে ব্যাংক, এমএফএস ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং সাধারণ মানুষের ব্যবহার অভ্যাসের ওপর।
৩১ অক্টোবরের মধ্যে প্রয়োজনীয় ফিচার যুক্ত করে ১ নভেম্বর থেকে সেবাটি চালু করার লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর গ্রাহকেরা কতটা সহজে ব্যক্তিগত বাংলা কিউআর তৈরি, সংরক্ষণ ও ব্যবহার করতে পারেন এবং বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস প্ল্যাটফর্মের মধ্যে আন্তঃলেনদেন কতটা নির্বিঘ্ন হয়—সেটিই হবে এই উদ্যোগের বড় পরীক্ষা।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হলে বাংলা কিউআর শুধু দোকানে পেমেন্টের মাধ্যম হিসেবে নয়, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি অর্থ পাঠানোর একটি সর্বজনীন ডিজিটাল মাধ্যম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


0 মন্তব্যসমূহ