রাতে আরও বাড়ছে মেট্রোরেলের যাত্রা, সেপ্টেম্বর থেকে চলতে পারে রাত ১১টা পর্যন্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক,পকেট নিউজ | ১২ আগস্ট ২০২৬
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে রাতে মেট্রোরেলের চলাচল আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাত্রীচাপ সামাল দিতে চলতি আগস্টের শেষ দিকে আরও দুটি ট্রেন যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। একই সঙ্গে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে মেট্রোরেলের রাতের চলাচলের সময় আরও ২০ মিনিট থেকে ৩০ মিনিট বাড়িয়ে রাত ১১টা পর্যন্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে।
মেট্রোরেলের বর্তমান সময়সূচিতে রাতের শেষ ট্রেনগুলোতে ব্যাপক ভিড় হচ্ছে। বিশেষ করে অফিস, ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রাত পর্যন্ত কর্মরত মানুষের জন্য শেষ ট্রেন ধরতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। এ পরিস্থিতিতে ট্রেনের সংখ্যা ও চলাচলের সময় বাড়ানোর উদ্যোগকে যাত্রীসেবায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাতে বাড়ছে আরও দুটি ট্রেন
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ জুন থেকে রাতে উভয় দিকের ট্রেন চলাচলের সময় ২০ মিনিট করে বাড়ানো হয়েছে। তবে শেষের দিকে ট্রেনগুলোর মধ্যে প্রায় ২০ মিনিটের বিরতি থাকায় বাড়তি সময় চালু হলেও যাত্রীদের ভিড় পুরোপুরি কমেনি।
এরই মধ্যে রাতে দুটি অতিরিক্ত ট্রেন চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি আগস্টের শেষ দিকে নতুন দুটি ট্রেন যুক্ত হলে শেষের ট্রেনগুলোর মধ্যকার বিরতি ২০ মিনিট থেকে কমে প্রায় ৭–৮ মিনিটে নেমে আসতে পারে।
ফলে রাতের শেষ সময়ে স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং একটি ট্রেনে অতিরিক্ত যাত্রী ওঠার চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাড়তি ট্রেন চালুর পর যাত্রী বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার
রাতে মেট্রোরেলের চলাচলের সময় বাড়ানোর পর যাত্রীসংখ্যাতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। দুটি ট্রেন বাড়ানোর পর মেট্রোরেলে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার অতিরিক্ত যাত্রী যাতায়াত করছেন।
এই বাড়তি যাত্রীচাপই মূলত রাতের ট্রেনের সংখ্যা আরও বাড়ানোর অন্যতম কারণ। কর্তৃপক্ষের ধারণা, সময় ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হলে রাতের যাত্রীদের জন্য মেট্রোরেল আরও কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনে পরিণত হবে।
সেপ্টেম্বর থেকে শেষ ট্রেন রাত ১১টায়?
বর্তমানে রাতে মতিঝিল থেকে উত্তরা অভিমুখী সর্বশেষ ট্রেন ছাড়ে রাত সাড়ে ১০টায়। অন্যদিকে উত্তরা থেকে মতিঝিলের পথে সর্বশেষ ট্রেন ছাড়ে রাত ৯টা ৫০ মিনিটে।
তবে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে রাতের চলাচলের সময় আরও ২০ মিনিট থেকে আধা ঘণ্টা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে রাত ১১টা পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল করতে পারে।
ডিএমটিসিএলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সময়সূচি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
চালক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ চলছে
রাতে মেট্রোরেলের চলাচলের সময় বাড়াতে হলে অতিরিক্ত চালক বা অপারেটরের প্রয়োজন হবে। এ কারণে ইতিমধ্যে নতুন অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নতুন নিয়োগ পাওয়া অপারেটরদের প্রশিক্ষণ চলছে। আগামী ২৬ আগস্ট তাদের প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার কথা। এরপর তাঁদের দিয়ে ট্রেন পরিচালনা শুরু করা হবে।
রাতের চলাচলের সময় বাড়ানোর পাশাপাশি ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য কারিগরি কাজ যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে।
সকালে সময় বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই
মেট্রোরেলের রাতের সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সকালের চলাচলের সময় আপাতত বাড়ানো হচ্ছে না।
বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিলের উদ্দেশে দিনের প্রথম মেট্রোরেল ছাড়ে সকাল সাড়ে ৬টায়। আর মতিঝিল থেকে উত্তরা অভিমুখী প্রথম ট্রেন ছাড়ে সকাল সোয়া ৭টায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত সকালের সময়সূচিতে পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই।
সাড়ে তিন মিনিট পরপর ট্রেন চালানোর সক্ষমতা
ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজন হলে প্রায় সাড়ে তিন মিনিট পরপর একটি করে ট্রেন চালানোর সক্ষমতা রয়েছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের।
মেট্রোরেল প্রকল্প গ্রহণের সময় ধারণা করা হয়েছিল, সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নিয়মিত ট্রেন চলাচল করবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় লোকবলের ঘাটতির কারণে শুরু থেকেই সেই পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
এখন ধাপে ধাপে জনবল বাড়ানো এবং পরিচালন সক্ষমতা উন্নত করার মাধ্যমে মেট্রোরেলের চলাচলের সময় বাড়ানো হচ্ছে।
প্রতিদিন সাড়ে চার লাখ যাত্রী
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে চার লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন। প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী এই পথে দৈনিক প্রায় পাঁচ লাখ যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা ও চাহিদা বিবেচনায় রাখা হয়েছিল।
এদিকে মেট্রোরেল কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের কাজও চলছে। বর্ধিত অংশ আগামী বছর চালু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হলে যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তখন প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ ৭৭ হাজার যাত্রী মেট্রোরেল ব্যবহার করতে পারেন।
যাত্রীদের জন্য বাড়ছে স্বস্তির সম্ভাবনা
রাতের শেষ ট্রেন ধরতে গিয়ে বর্তমানে যাত্রীদের যে ভোগান্তি হচ্ছে, অতিরিক্ত দুটি ট্রেন চালু হলে তা অনেকটাই কমতে পারে। বিশেষ করে রাতের অফিস, হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য কর্মস্থল থেকে ফেরা মানুষের জন্য এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ।
শাহবাগ এলাকায় কাজ করা মেট্রোরেল যাত্রী রবিউল ইসলামের মতো অনেক যাত্রীর জন্য শেষ ট্রেন মিস করা বড় ধরনের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাতের ট্রেনের সংখ্যা ও সময় বাড়লে তাঁদের বিকল্প গণপরিবহনের ওপর নির্ভরতা কমবে।
২০২২ সালে যাত্রা শুরু, এখন নতুন পর্যায়ে
ঢাকায় মেট্রোরেলের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয় ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর। প্রথম পর্যায়ে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করত। পরে ধাপে ধাপে নতুন স্টেশন যুক্ত হয় এবং মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারিত হয়।
২০২৩ সালের শেষ দিনে মতিঝিল পর্যন্ত সব স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা শুরু হয়। এরপর থেকে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় মেট্রোরেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বর্তমানে যাত্রীচাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনের সংখ্যা, চলাচলের সময় এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ—সবকিছুকেই গুরুত্ব দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে, চলতি মাসের শেষ দিকে রাতে আরও দুটি ট্রেন যুক্ত হলে শেষ সময়ে মেট্রোরেলের অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। আর সেপ্টেম্বর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চলাচলের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাতের যাত্রীদের জন্য রাজধানীর দ্রুতগতির এই গণপরিবহন আরও কার্যকর হয়ে উঠবে। তবে চূড়ান্ত সময়সূচি ও কার্যকর তারিখ কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের পরই নিশ্চিত হবে।


0 মন্তব্যসমূহ