সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন, সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ল মূল বেতন
নিজস্ব প্রতিবেদক,পকেট নিউজ | ৩১ আগস্ট ২০২৬
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। সোমবার (৩১ আগস্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নবম জাতীয় বেতনকাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের গ্রেডভেদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে।
নতুন বেতনস্কেলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডে। ১ থেকে ১১ নম্বর গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। অন্যদিকে ১২ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার হবে ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশের মধ্যে। ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে।
কোন গ্রেডে কত বেতন
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী, গ্রেড-১-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। গ্রেড-২-এ ৬৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার, গ্রেড-৩-এ ৫৬ হাজার ৫০০ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার এবং গ্রেড-৪-এ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে।
গ্রেড-৫-এ প্রারম্ভিক মূল বেতন ৪৩ হাজার থেকে বেড়ে ৮৬ হাজার টাকা এবং গ্রেড-৬-এ ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৭১ হাজার টাকা হয়েছে। গ্রেড-৭-এ ২৯ হাজার থেকে ৫৮ হাজার, গ্রেড-৮-এ ২৩ হাজার থেকে ৪৬ হাজার এবং গ্রেড-৯-এ ২২ হাজার থেকে ৪৪ হাজার টাকা করা হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রেড-১০-এর বেতন ১৬ হাজার থেকে বেড়ে ৩২ হাজার টাকা এবং গ্রেড-১১-এর বেতন ১২ হাজার ৫০০ থেকে দ্বিগুণ হয়ে ২৫ হাজার টাকা হয়েছে।
নিচের গ্রেডগুলোতেও উল্লেখযোগ্য হারে বেতন বাড়ানো হয়েছে। গ্রেড-১২-এ ১১ হাজার ৩০০ থেকে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা, গ্রেড-১৩-এ ১১ হাজার থেকে ২৪ হাজার টাকা, গ্রেড-১৪-এ ১০ হাজার ২০০ থেকে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-১৫-এ ৯ হাজার ৭০০ থেকে ২২ হাজার ৮০০ টাকা করা হয়েছে।
এ ছাড়া গ্রেড-১৬-এ ৯ হাজার ৩০০ থেকে ২১ হাজার ৯০০ টাকা, গ্রেড-১৭-এ ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ৪০০ টাকা, গ্রেড-১৮-এ ৮ হাজার ৮০০ থেকে ২১ হাজার টাকা, গ্রেড-১৯-এ ৮ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-২০-এ ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামোর চিত্র
| গ্রেড | বর্তমান প্রারম্ভিক মূল বেতন | নতুন প্রারম্ভিক মূল বেতন |
|---|---|---|
| ১ | ৭৮,০০০ | ১,৫৬,০০০ |
| ২ | ৬৬,০০০ | ১,৩২,০০০ |
| ৩ | ৫৬,৫০০ | ১,১৩,০০০ |
| ৪ | ৫০,০০০ | ১,০০,০০০ |
| ৫ | ৪৩,০০০ | ৮৬,০০০ |
| ৬ | ৩৫,৫০০ | ৭১,০০০ |
| ৭ | ২৯,০০০ | ৫৮,০০০ |
| ৮ | ২৩,০০০ | ৪৬,০০০ |
| ৯ | ২২,০০০ | ৪৪,০০০ |
| ১০ | ১৬,০০০ | ৩২,০০০ |
| ১১ | ১২,৫০০ | ২৫,০০০ |
| ১২ | ১১,৩০০ | ২৪,৩০০ |
| ১৩ | ১১,০০০ | ২৪,০০০ |
| ১৪ | ১০,২০০ | ২৩,৫০০ |
| ১৫ | ৯,৭০০ | ২২,৮০০ |
| ১৬ | ৯,৩০০ | ২১,৯০০ |
| ১৭ | ৯,০০০ | ২১,৪০০ |
| ১৮ | ৮,৮০০ | ২১,০০০ |
| ১৯ | ৮,৫০০ | ২০,৫০০ |
| ২০ | ৮,২৫০ | ২০,০০০ |
কীভাবে এল নতুন বেতনকাঠামো
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামোর সুপারিশ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় চলতি বছরের ২১ এপ্রিল। ওই সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির দায়িত্ব ছিল প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামোর সুপারিশ করা।
কমিটি প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। পাশাপাশি দুই ধাপে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে মূল বেতন এবং পরবর্তী ধাপে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার সম্ভাবনা ছিল।
এর আগে অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২৩ সদস্যের ওই কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল।
কমিশনের সুপারিশে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব ছিল। সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশও করা হয়েছিল।
বর্তমানে মন্ত্রিসভা যে কাঠামো অনুমোদন করেছে, সেখানে সর্বোচ্চ প্রারম্ভিক মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ কমিশনের প্রস্তাবের তুলনায় সর্বোচ্চ বেতন সামান্য কম হলেও নিম্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন রাখা হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর কী প্রভাব পড়বে
নতুন বেতনকাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়া। গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা হওয়ায় এ শ্রেণির কর্মচারীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
মূল বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে যদি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে পুনর্নির্ধারণ করা হয়, তাহলে সরকারি চাকরিজীবীদের মোট মাসিক আয় আরও বাড়তে পারে। তবে এসব ভাতা কীভাবে ও কখন কার্যকর হবে, তা বাস্তবায়নসংক্রান্ত সরকারি আদেশে স্পষ্ট হওয়ার বিষয়।
অন্যদিকে বড় পরিসরে বেতন বাড়ানোর ফলে সরকারের নিয়মিত পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ফলে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক প্রভাব, বাজেটের ওপর চাপ এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর প্রত্যাশা
গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বেড়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের দাবি ছিল, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নতুন কাঠামোতে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হওয়ায় তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিতে বেতনকাঠামোর ভারসাম্য এবং বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বেতন ব্যবধান নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে।
এখন বাস্তবায়নের অপেক্ষা
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা, বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, নতুন স্কেলে পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্টের হিসাব—এসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা জারি করা হবে।
ফলে মন্ত্রিসভার অনুমোদনকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে নতুন বেতন কত তারিখ থেকে এবং কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সব মিলিয়ে নতুন বেতনকাঠামো সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের একটি বড় পদক্ষেপ। সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের মধ্য দিয়ে সরকারি বেতনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। তবে এই সিদ্ধান্তের পূর্ণ সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের সময়সূচি, ভাতা পুনর্নির্ধারণ এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর।


0 মন্তব্যসমূহ