ট্রাম্পকে ঘিরে তুরস্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ফেরার পথে রহস্যময় ‘ছলনা’, নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
বিশ্ব ডেস্ক, পকেট নিউজ
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার যাত্রা নিয়ে এক মাস পর সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ন্যাটো সম্মেলন শেষে ট্রাম্প কোন উড়োজাহাজে দেশে ফিরবেন, তা নিয়ে শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বদল, সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশ এবং শেষ পর্যন্ত তৃতীয় একটি সামরিক উড়োজাহাজ ব্যবহারের ঘটনা—সব মিলিয়ে পুরো যাত্রাটিই ছিল অত্যন্ত গোপনীয় ও নাটকীয়।
রয়টার্সের সাংবাদিক গ্রাম স্ল্যাটারি, যিনি ওই সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন, গত ৮ জুলাইয়ের ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, তখন সাংবাদিকেরা ঘটনাটির প্রকৃত কারণ বুঝতে না পারলেও পরে জানা যায়, সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি বিবেচনায় ট্রাম্পকে ঘিরে একটি পরিকল্পিত ছলনার অংশ হিসেবেই উড়োজাহাজ পরিবর্তন করা হয়েছিল।
শেষ মুহূর্তে বদলে যায় ট্রাম্পের ফেরার পরিকল্পনা
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্প কাতারের রাজপরিবারের উপহার দেওয়া নতুন উড়োজাহাজে গিয়েছিলেন। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্ত করার পর এটিকে নতুন ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
কিন্তু সম্মেলন শেষে হঠাৎ তিনি ঘোষণা দেন, ওই উড়োজাহাজে করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরবেন না। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প জানান, কাতারের দেওয়া উড়োজাহাজটি আগেই যুক্তরাজ্যের মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে মার্কিন সামরিক সদস্যরা ও তাঁদের পরিবার সেটি দেখার সুযোগ পাবেন।
ট্রাম্প জানান, তিনি পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে করে মিলডেনহল যাবেন। তবে এরপর কীভাবে ওয়াশিংটনে ফিরবেন, সে বিষয়ে তখন বিস্তারিত জানাননি তিনি।
সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হয়। কারণ, ট্রাম্প যে উড়োজাহাজে তুরস্কে গিয়েছিলেন, সেটি দিয়েই কেন ফিরছেন না—এর পরিষ্কার ব্যাখ্যা তখন পাওয়া যাচ্ছিল না।
সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়
আঙ্কারা থেকে উড্ডয়নের সময় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। সাংবাদিকদের যে উড়োজাহাজে তোলা হয়েছিল, সেটিকেই তাঁরা ট্রাম্পকে বহনকারী বিমান হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু উড়োজাহাজে ওঠার সময় হোয়াইট হাউসের কর্মীরা সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলেন।
কারণ জানতে চাইলে তাঁদের বলা হয়, এটি সিক্রেট সার্ভিসের অনুরোধ।
রয়টার্সের সাংবাদিক গ্রাম স্ল্যাটারির কাছে নির্দেশটি বিশেষভাবে অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। তাঁর আগের অভিজ্ঞতায় প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজে এমন নির্দেশনা নিয়মিত ঘটনা নয়।
পরে জানা যায়, পুরো ঘটনাটিই ছিল একটি নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ।
আসল ঘটনা প্রকাশ পায় এক মাস পর
স্ল্যাটারির বর্ণনা অনুযায়ী, আঙ্কারা থেকে উড়োজাহাজটি যুক্তরাজ্যের মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে পৌঁছায়। তখনও সাংবাদিকেরা মনে করছিলেন, ট্রাম্প হয়তো তাঁদের সঙ্গেই রয়েছেন।
কিন্তু উড়োজাহাজ থেকে নামার সময় তাঁরা দেখতে পান, ট্রাম্প একই উড়োজাহাজের অন্য একটি অংশ থেকে বের হয়ে আসছেন। এরপর তাঁকে অনুসরণ করতে বলা হয়।
ট্রাম্প হেঁটে এগিয়ে যান কাতারের দেওয়া নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানের দিকে। সেটি একই বিমানঘাঁটিতে কয়েক শ গজ দূরে দাঁড় করানো ছিল।
সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা প্রেসিডেন্টকে ঘিরে রাখেন। পাশাপাশি একটি কালো সরকারি এসইউভিও ধীরে ধীরে তাঁদের সঙ্গে এগিয়ে যায়।
পরে জানা যায়, ট্রাম্প ওই উড়োজাহাজে করে আঙ্কারা থেকে মিলডেনহল পর্যন্ত আসেননি। বরং সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত রেখে অন্য একটি সামরিক উড়োজাহাজে করে তিনি সেখানে পৌঁছান এবং এরপর নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠেন।
অর্থাৎ সাংবাদিকদের একটি উড়োজাহাজে রাখা হয়েছিল, যাতে প্রেসিডেন্টের প্রকৃত যাত্রাপথ ও অবস্থান গোপন রাখা যায়।
ইরানি হামলার আশঙ্কা কি কারণ ছিল?
এই ঘটনার পেছনে ইরানের সম্ভাব্য হুমকি ছিল কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সফরের শেষ দিন ট্রাম্প সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে বারবার ইরানের পক্ষ থেকে তাঁকে হত্যার কথিত দীর্ঘদিনের হুমকির প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। ফলে উড়োজাহাজ পরিবর্তনের সঙ্গে নিরাপত্তা হুমকির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।
স্ল্যাটারি জানান, তাঁদের ধারণা ছিল, কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটিতে হয়তো প্রেসিডেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি যুক্ত হয়নি।
তবে ট্রাম্প পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় উড়োজাহাজ পরিবর্তনের পেছনে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ থাকার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেন।
‘আপনি মারা গেলে আপনারাও যাবেন’
তবে সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার কারণ জানতে চাইলে ট্রাম্প ইরানের হুমকির বিষয়টি স্বীকার করেন।
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, যদি তাঁর ওপর হামলা হয়, তাহলে তাঁর সঙ্গে থাকা সাংবাদিকেরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে অন্তত এটুকু স্পষ্ট হয় যে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে সম্ভাব্য হুমকির বিষয়টি সফরের সময় বিবেচনায় ছিল।
কেন এত গোপনীয়তা?
প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস ও হোয়াইট হাউস বিভিন্ন ধরনের গোপন কৌশল ব্যবহার করে থাকে। বিশেষ করে কোনো সম্ভাব্য হামলা বা নজরদারির আশঙ্কা থাকলে প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান ও যাত্রাপথ গোপন রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ডারউইন টেস্টের মতো প্রকাশ্য সফর নয়, বরং ন্যাটো সম্মেলন ঘিরে ট্রাম্পের তুরস্ক সফর ছিল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এর ওপর ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল।
এ কারণেই সাংবাদিকদের একটি উড়োজাহাজে রেখে ট্রাম্পকে অন্য উড়োজাহাজে স্থানান্তর এবং পরে নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলে এখন ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান নিয়েও প্রশ্ন
ট্রাম্পকে কাতারের রাজপরিবার যে উড়োজাহাজটি উপহার দিয়েছে, সেটি নিয়ে এর আগেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। উড়োজাহাজটিকে প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের উপযোগী করতে বিপুল পরিমাণ সংস্কার ও নিরাপত্তা সংযোজন করা হচ্ছে।
কিন্তু স্ল্যাটারির বর্ণনা অনুযায়ী, উড়োজাহাজটিতে তখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সুবিধার ঘাটতি থাকতে পারে। ফলে প্রেসিডেন্টের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সফরে সেটিকে ব্যবহার করা কতটা নিরাপদ—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
তবে এসব নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্যের সবগুলোই প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে কোন নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ঘাটতির কারণে ট্রাম্পকে উড়োজাহাজ পরিবর্তন করতে হয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
রহস্যের কেন্দ্রে তৃতীয় উড়োজাহাজ
ঘটনার সবচেয়ে নাটকীয় দিক হলো—সাংবাদিকেরা প্রথমে জানতেন দুটি উড়োজাহাজের কথা। একটি ছিল তাঁদের বহনকারী পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান, অন্যটি কাতারের দেওয়া নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান।
পরে তাঁরা জানতে পারেন, পুরো পরিকল্পনায় তৃতীয় একটি সামরিক উড়োজাহাজও ব্যবহৃত হয়েছিল।
এই তৃতীয় উড়োজাহাজেই ট্রাম্পকে গোপনে স্থানান্তর করা হয় বলে স্ল্যাটারির বর্ণনায় উঠে এসেছে। ফলে সাংবাদিকদের উপস্থিতি সত্ত্বেও প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান গোপন রাখা সম্ভব হয়।
এ ধরনের কৌশল মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তাব্যবস্থার জটিলতা এবং সম্ভাব্য হুমকির ক্ষেত্রে কতটা কঠোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়, তার একটি বিরল উদাহরণ হিসেবেই সামনে এসেছে।
শেষ কথা
তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার ঘটনাটি প্রথমে একটি সাধারণ উড়োজাহাজ পরিবর্তনের ঘটনা বলে মনে হলেও এক মাস পর প্রকাশিত তথ্য পুরো বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত রেখে প্রেসিডেন্টের প্রকৃত যাত্রাপথ গোপন রাখা, জানালার পর্দা নামানোর নির্দেশ এবং তৃতীয় সামরিক উড়োজাহাজের ব্যবহার—সবকিছু মিলিয়ে এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি নিরাপত্তা অভিযান।
তবে ট্রাম্পকে ঠিক কোন নির্দিষ্ট হুমকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে তুরস্ক থেকে তাঁর সেই রহস্যময় প্রত্যাবর্তন ঘিরে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।


0 মন্তব্যসমূহ