আমদানির শীর্ষে কয়লা, ১০ পণ্যেই আসে মোট আমদানির ৬৩ শতাংশ
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ১০ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ শ্রেণির পণ্য আমদানি হলেও দেশের মোট আমদানির বড় একটি অংশ মাত্র কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি এবং অবকাঠামো নির্মাণের উপকরণই এখন দেশের আমদানি তালিকার শীর্ষে রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘ ২৫ বছর শীর্ষস্থান ধরে রাখা সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকারকে পেছনে ফেলে প্রথমবারের মতো শীর্ষে উঠেছে কয়লা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য ও মাঠপর্যায়ের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ৪৬টি কাস্টমস স্টেশন দিয়ে মোট ১৫ কোটি ৮৬ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ পণ্যের পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ৯৮ লাখ টন। অর্থাৎ দেশের মোট আমদানি করা প্রতি ১০০ কেজি পণ্যের প্রায় ৬৩ কেজিই এসেছে মাত্র ১০ ধরনের পণ্য থেকে।
এই চিত্র বাংলাদেশের আমদানি কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। পরিমাণের বিচারে দেশের আমদানিতে সরাসরি ভোগ্যপণ্যের চেয়ে শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও উন্নয়ন প্রকল্পের উপকরণের আধিপত্য বেশি।
২৫ বছরের আধিপত্য ভেঙে শীর্ষে কয়লা
২০০০-০১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত টানা ২৫ বছর পরিমাণের হিসাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি আমদানি হওয়া পণ্য ছিল ক্লিংকার। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে।
গত অর্থবছরে ২ কোটি ৭ লাখ টন কয়লা আমদানি হয়েছে। এর ফলে প্রথমবারের মতো পরিমাণের হিসাবে দেশের সবচেয়ে বড় আমদানি পণ্যে পরিণত হয়েছে কয়লা।
কয়লার এই উত্থানের পেছনে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গত অর্থবছরে আমদানি করা মোট কয়লার প্রায় ৭৫ শতাংশই ব্যবহার করেছে দেশের ছয়টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
অর্থাৎ কয়লার আমদানি বৃদ্ধি শুধু শিল্পকারখানার জ্বালানি চাহিদার কারণে নয়; বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গেও এটি সরাসরি সম্পর্কিত।
দ্বিতীয় অবস্থানে ক্লিংকার
দীর্ঘদিনের শীর্ষস্থান হারিয়ে এবার দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে এসেছে ক্লিংকার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ১ কোটি ৯২ লাখ টন ক্লিংকার আমদানি হয়েছে।
বাংলাদেশের সিমেন্টশিল্প মূলত আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। দেশের সিমেন্ট কারখানাগুলোতে ক্লিংকারের পাশাপাশি স্ল্যাগ, চুনাপাথর ও ফ্লাই অ্যাশসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়।
শীর্ষ ১০ আমদানি পণ্যের তালিকাতেও সিমেন্টশিল্পের এসব কাঁচামালের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।
ক্লিংকারের পর চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে স্ল্যাগ, যার আমদানি হয়েছে প্রায় ৮৩ লাখ টন। ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা চুনাপাথর আমদানি হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টন। আর দশম অবস্থানে থাকা ফ্লাই অ্যাশ আমদানি হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টন।
চার ধরনের কাঁচামাল মিলিয়ে সিমেন্টশিল্পে ব্যবহৃত এসব পণ্যের আমদানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ টন।
অর্থাৎ শুধু সিমেন্টশিল্পের কাঁচামালই শীর্ষ ১০ আমদানি পণ্যের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে।
তৃতীয় বৃহত্তম আমদানি পণ্য চূর্ণ পাথর
আমদানির পরিমাণের হিসাবে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চূর্ণ পাথর। গত অর্থবছরে দেশে প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ টন চূর্ণ পাথর আমদানি করা হয়েছে।
সড়ক নির্মাণ, ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নকাজে চূর্ণ পাথরের ব্যবহার রয়েছে। ফলে দেশের নির্মাণ খাতের কর্মকাণ্ড ও উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে এ পণ্যের আমদানির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বোল্ডার পাথরও আমদানি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৫৫ লাখ টন বোল্ডার পাথর আমদানি করা হয়েছে, যা পরিমাণের হিসাবে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে।
নদীশাসন, বাঁধ নির্মাণ এবং বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নকাজে বোল্ডার পাথরের ব্যবহার হয়।
শীর্ষ দশে একমাত্র ভোগ্যপণ্য গম
শীর্ষ ১০ আমদানি পণ্যের মধ্যে একমাত্র সরাসরি ভোগ্যপণ্য হিসেবে রয়েছে গম।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে। পরিমাণের বিচারে এটি রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে।
বাংলাদেশে গমের চাহিদার আনুমানিক ১৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বাকি প্রায় ৮৫ শতাংশ চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। ফলে দেশের খাদ্যশস্যের মধ্যে গমই সবচেয়ে বড় আমদানি পণ্য হয়ে আছে।
দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে গমের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং স্থানীয় উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম থাকায় ভবিষ্যতেও গমের আমদানি উল্লেখযোগ্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
রড তৈরির কাঁচামাল স্ক্র্যাপ সপ্তম
দেশের ইস্পাতশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল পুরোনো লোহার স্ক্র্যাপও রয়েছে শীর্ষ ১০ আমদানি পণ্যের তালিকায়।
গত অর্থবছরে প্রায় ৫৭ লাখ টন স্ক্র্যাপ আমদানি হয়েছে। পরিমাণের হিসাবে এটি সপ্তম অবস্থানে রয়েছে।
দেশের ইস্পাত কারখানাগুলোতে আমদানি করা এসব স্ক্র্যাপ গলিয়ে বিলেট তৈরি করা হয়। পরে সেই বিলেট ব্যবহার করে রডসহ বিভিন্ন ধরনের ইস্পাতপণ্য উৎপাদন করা হয়।
ফলে স্ক্র্যাপের বিপুল আমদানি দেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতের সঙ্গে ইস্পাতশিল্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরও ইঙ্গিত দেয়।
নবম অবস্থানে এলএনজি
জ্বালানি খাতে কয়লার পাশাপাশি বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতার আরেকটি বড় উদাহরণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫১ লাখ টন এলএনজি আমদানি হয়েছে। পরিমাণের বিচারে এটি রয়েছে নবম অবস্থানে।
দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানি করছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি দেশে এনে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করা হয় এবং তা জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা পূরণে সহায়তা মিললেও একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির ওপর দেশের নির্ভরতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শীর্ষ ১০ পণ্যের তালিকা কী বলছে?
২০২৫-২৬ অর্থবছরের আমদানি চিত্র বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা সামনে আসে।
প্রথমত, দেশের আমদানির বড় অংশ সরাসরি মানুষের ভোগের জন্য নয়। কয়লা ও এলএনজি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হচ্ছে। ক্লিংকার, স্ল্যাগ, চুনাপাথর ও ফ্লাই অ্যাশ সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল। স্ক্র্যাপ ইস্পাতশিল্পের কাঁচামাল। চূর্ণ পাথর ও বোল্ডার পাথর ব্যবহার হচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণে।
অর্থাৎ আমদানির বড় অংশই দেশের উৎপাদন, বিদ্যুৎ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
দ্বিতীয়ত, শীর্ষ ১০ পণ্যের তালিকায় সিমেন্ট ও ইস্পাত খাতের কাঁচামালের আধিপত্য দেশের নির্মাণ খাতের আকার ও চাহিদার একটি ধারণা দেয়।
তৃতীয়ত, কয়লার শীর্ষে উঠে আসা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর গুরুত্ব বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এনেছে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লে আমদানিও বাড়বে
সিমেন্ট, ভোগ্যপণ্য খাতের উদ্যোক্তা ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হকের মতে, পরিমাণের হিসাবে সবচেয়ে বেশি আমদানি হওয়া পণ্যগুলোর বড় অংশ শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও অবকাঠামো নির্মাণের উপকরণ।
তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ বাড়লে এসব পণ্যের চাহিদাও বাড়বে।
এই বাস্তবতা থেকে বলা যায়, শীর্ষ আমদানি পণ্যের পরিমাণ শুধু আমদানির ওপর নির্ভরতা বোঝায় না; বরং দেশের শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের গতিপ্রকৃতিরও একটি প্রতিচ্ছবি।
সামনে চ্যালেঞ্জ আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি নিরাপত্তা
তবে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল ও জ্বালানি আমদানির সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লা, গ্যাস, পাথর বা অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে গেলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে গমের মতো খাদ্যপণ্যে উচ্চ আমদানিনির্ভরতা আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা বা বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির সময় খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আমদানি চিত্র বলছে—বাংলাদেশের আমদানি কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু এখন শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়ন। দীর্ঘ ২৫ বছরের ক্লিংকার-আধিপত্য ভেঙে কয়লার শীর্ষে ওঠা সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতীক।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়লে এসব পণ্যের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


0 মন্তব্যসমূহ