কার্ড ঢোকানোর ঝামেলা শেষ, দেশে চালু এনএফসি প্রযুক্তির এটিএম
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ৯ আগস্ট ২০২৬
এটিএম বুথে টাকা তুলতে গিয়ে কার্ড আটকে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। বিদ্যুৎ চলে যাওয়া, যন্ত্রের ত্রুটি কিংবা কার্ড রিডারের সমস্যায় অনেক সময় গ্রাহকের কার্ড মেশিনের ভেতরে আটকে যায়। পরে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে কার্ড ফেরত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হয়, অন্যদিকে তৈরি হয় বাড়তি ভোগান্তি।
গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশে চালু হয়েছে স্পর্শহীন বা এনএফসি (নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন) প্রযুক্তির এটিএম সেবা। বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক তাদের এটিএম নেটওয়ার্কে নতুন এই প্রযুক্তি যুক্ত করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু সিটি ব্যাংকের গ্রাহক নন, অন্যান্য ব্যাংকের গ্রাহকেরাও সিটি ব্যাংকের এনএফসি-সুবিধাযুক্ত এটিএম ব্যবহার করতে পারবেন।
নতুন প্রযুক্তিতে এটিএমে কার্ড ঢোকানোর প্রয়োজন নেই। নির্ধারিত স্থানে কার্ডটি শুধু ট্যাপ করলেই মেশিন কার্ড শনাক্ত করবে। এরপর পিন নম্বর দিয়ে স্বাভাবিক নিয়মেই টাকা তোলা, জমা এবং অন্যান্য নির্ধারিত ব্যাংকিং লেনদেন করা যাবে।
কীভাবে কাজ করবে এনএফসি এটিএম?
প্রচলিত এটিএমে গ্রাহককে প্রথমে কার্ডটি মেশিনের নির্দিষ্ট স্লটে প্রবেশ করাতে হয়। কার্ডের তথ্য শনাক্ত করার পর পিন নম্বর দিতে হয়। লেনদেন শেষে আবার কার্ডটি মেশিন থেকে বেরিয়ে আসে।
এই প্রক্রিয়ায় কার্ড মেশিনের ভেতরে প্রবেশ করানোর কারণে কখনো কখনো কার্ড আটকে যেতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা এটিএমের যান্ত্রিক ত্রুটি হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এনএফসি প্রযুক্তির এটিএমে সেই ঝুঁকি নেই। বুথের নির্দিষ্ট স্থানে কার্ডটি স্পর্শ বা ট্যাপ করলেই এটিএম কার্ডের তথ্য শনাক্ত করতে পারে। এরপর গ্রাহক পিন নম্বর দিলে লেনদেন সম্পন্ন করা যায়।
অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় কার্ড মেশিনের ভেতরে ঢুকবে না—শুধু নির্দিষ্ট স্থানে ট্যাপ করতে হবে।
ইতিমধ্যে ৭০-৮০টি এটিএমে সুবিধা
সিটি ব্যাংক জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে নতুন প্রযুক্তির প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি এটিএম স্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে নতুন এটিএম স্থাপন কিংবা পুরোনো মেশিন পরিবর্তনের সময় এনএফসি প্রযুক্তির এটিএম বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে ব্যাংকটির।
ব্যাংকটির দাবি, বাংলাদেশে তারাই প্রথম এই ধরনের প্রযুক্তির এটিএম চালু করেছে।
সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অরূপ হায়দার বলেন, গ্রাহকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই নতুন প্রযুক্তির এটিএম চালু করা হয়েছে। এতে এটিএমে কার্ড প্রবেশ না করিয়েই দ্রুত ও স্বচ্ছন্দে লেনদেন করা সম্ভব হবে।
সুবিধা পাবেন অন্য ব্যাংকের গ্রাহকরাও
সিটি ব্যাংকের এটিএম নেটওয়ার্কে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হলেও এর সুবিধা শুধু সিটি ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বাংলাদেশের ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি) ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি ব্যাংকের গ্রাহক অন্য ব্যাংকের এটিএম ব্যবহার করতে পারেন। ফলে এনএফসি সুবিধাযুক্ত সিটি ব্যাংকের এটিএমে অন্য ব্যাংকের গ্রাহকেরাও তাঁদের উপযোগী কার্ড ব্যবহার করে লেনদেন করতে পারবেন।
তবে অন্য ব্যাংকের এটিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আন্তঃব্যাংক লেনদেন ফি প্রযোজ্য হতে পারে। বর্তমানে এ ধরনের লেনদেনে প্রতি ট্রানজ্যাকশনে অতিরিক্ত ১৫ টাকা খরচ হয় বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
কার্ড আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে না
এনএফসি এটিএমের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো কার্ড আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
প্রচলিত এটিএমে কার্ড মেশিনের ভেতরে প্রবেশ করে। কোনো কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে বা মেশিনে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে কার্ডটি ভেতরে আটকে যেতে পারে। এরপর ব্যাংকের সহায়তা ছাড়া সেটি ফেরত পাওয়া সম্ভব হয় না।
নতুন প্রযুক্তিতে কার্ড মেশিনের ভেতরে প্রবেশ না করায় এ ধরনের ঝুঁকি কার্যত দূর হচ্ছে। ফলে জরুরি সময়ে টাকা তুলতে গিয়ে কার্ড আটকে যাওয়ার কারণে গ্রাহককে আর বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে হবে না।
স্কিমিংয়ের ঝুঁকি কমাতে পারে
এটিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্ডের তথ্য চুরি অন্যতম বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ। প্রচলিত কার্ডের ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে অপরাধীরা কখনো কখনো ‘স্কিমিং ডিভাইস’ ব্যবহার করে থাকে।
এনএফসি প্রযুক্তিতে কার্ড ও এটিএমের মধ্যে সরাসরি কাছাকাছি দূরত্বে যোগাযোগের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান হয়। ফলে প্রচলিত কার্ড রিডারের মতো কার্ডের ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ মেশিনের ভেতর দিয়ে পড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না।
সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দাবি, এই প্রযুক্তিতে কার্ড ক্লোনিং বা তথ্য চুরির ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে। তবে কোনো ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকেই শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়। গ্রাহকেরও পিন গোপন রাখা, অপরিচিত ব্যক্তির সহায়তা না নেওয়া এবং সন্দেহজনক এটিএম এড়িয়ে চলার মতো সাধারণ নিরাপত্তা সতর্কতা মেনে চলা প্রয়োজন।
কার্ডের স্থায়িত্বও বাড়তে পারে
বারবার এটিএমে কার্ড ঢোকানো ও বের করার ফলে দীর্ঘদিন ব্যবহারে কার্ডের ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ বা চিপে ক্ষয় হতে পারে। এতে একসময় কার্ড ঠিকভাবে কাজ না করার সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এনএফসি প্রযুক্তিতে কার্ড মেশিনের ভেতরে প্রবেশ না করায় এ ধরনের ঘর্ষণজনিত ক্ষয় কমবে। ফলে কার্ডের ব্যবহারকালও বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে কার্ড রিড করার জন্য মেশিনে প্রবেশ করানো এবং লেনদেন শেষে বের করে নেওয়ার বাড়তি সময়ও বেঁচে যাবে। এতে এটিএম ব্যবহারের পুরো প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন মাত্রা
বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং খাতে স্পর্শহীন প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। মোবাইল পেমেন্ট, কনট্যাক্টলেস কার্ড এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি এটিএমেও একই ধরনের প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় গ্রাহকের অভিজ্ঞতা আরও সহজ হচ্ছে।
বাংলাদেশেও ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে এটিএম ব্যবস্থায় এনএফসি প্রযুক্তির সংযোজন ব্যাংকিং সেবাকে আরও আধুনিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
বিশেষ করে কার্ড আটকে যাওয়ার মতো প্রচলিত সমস্যা কমানো, লেনদেনের সময় কমানো এবং কার্ডের শারীরিক ক্ষয় কমানোর কারণে নতুন প্রযুক্তিটি গ্রাহকদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই প্রযুক্তির সাফল্য নির্ভর করবে পর্যাপ্ত সংখ্যক এটিএমে সুবিধাটি ছড়িয়ে দেওয়া, বিভিন্ন ব্যাংকের এনএফসি-সমর্থিত কার্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখার ওপর।
এক নজরে এনএফসি এটিএমের সুবিধা
এটিএমে কার্ড ঢোকানোর প্রয়োজন নেই
নির্দিষ্ট স্থানে কার্ড ট্যাপ করেই লেনদেন শুরু করা যায়
কার্ড আটকে যাওয়ার ঝুঁকি নেই
লেনদেনের সময় কমতে পারে
কার্ডের চিপ ও ম্যাগনেটিক স্ট্রিপের ক্ষয় কমে
প্রচলিত স্কিমিংয়ের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক
সিটি ব্যাংকের পাশাপাশি অন্য ব্যাংকের গ্রাহকেরাও সুবিধা নিতে পারবেন
ভবিষ্যতে আরও বেশি এটিএমে প্রযুক্তিটি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের এটিএম ব্যবস্থায় এনএফসি প্রযুক্তির সংযোজন ব্যাংকিং সেবায় একটি নতুন পরিবর্তনের সূচনা করেছে। কার্ড আটকে যাওয়ার ভোগান্তি কমানো থেকে শুরু করে দ্রুত ও তুলনামূলক নিরাপদ লেনদেন—গ্রাহকের দৈনন্দিন ব্যাংকিং অভিজ্ঞতায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে দেশের আরও ব্যাংক ও এটিএম নেটওয়ার্কে এমন স্পর্শহীন প্রযুক্তি যুক্ত হলে নগদ টাকা উত্তোলন ও অন্যান্য এটিএমভিত্তিক সেবা আরও সহজ, দ্রুত ও আধুনিক হয়ে উঠবে।


0 মন্তব্যসমূহ