‘গ্যাসের ব্যথা’ ভেবে ভুল নয়, বুকব্যথা হতে পারে হার্ট অ্যাটাকের সংকেত
স্বাস্থ্য ডেস্ক, পকেট নিউজ | ৮ আগস্ট ২০২৬
হঠাৎ বুকব্যথা শুরু হলে অনেকেরই প্রথম মনে হয়, ‘গ্যাসের সমস্যা হয়েছে।’ বিশেষ করে খাওয়ার পর বুক জ্বালাপোড়া, টক ঢেকুর বা পেটফাঁপার মতো উপসর্গ থাকলে অনেকে অ্যান্টাসিড কিংবা গ্যাসের ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা করেন। কিন্তু বুকের অস্বস্তি সব সময় গ্যাস বা অ্যাসিডিটির কারণে হয় না। কখনো এটি হতে পারে হৃদ্রোগের গুরুতর সংকেত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন ঘটে যখন হৃদ্পেশিতে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে হৃদ্পেশির ক্ষতি বাড়তে পারে এবং পরিস্থিতি জীবনসংকটাপন্ন হয়ে উঠতে পারে।
তাই বুকব্যথাকে শুধু ‘গ্যাস’ ধরে নিয়ে ঘরে বসে থাকা বিপজ্জনক হতে পারে। তবে গ্যাস বা অ্যাসিডিটির সঙ্গে হার্ট অ্যাটাকের কিছু উপসর্গের মিল থাকায় পার্থক্য বোঝা অনেক সময় কঠিন।
গ্যাসের ব্যথা নাকি হার্ট অ্যাটাক?
অ্যাসিডিটি বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের ক্ষেত্রে সাধারণত বুকের মাঝামাঝি জ্বালাপোড়া, টক ঢেকুর, পেটফাঁপা বা খাবারের পর অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। শোয়ার পর কিংবা নির্দিষ্ট কিছু খাবারের পর এসব উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী কিছু চেপে বসার মতো অনুভূতি, শক্ত করে ধরার মতো ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। এই অস্বস্তি কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হতে পারে, আবার কিছু সময় কমে গিয়ে পুনরায় দেখা দিতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা বা অস্বস্তি বুক থেকে শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে এক বা দুই হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড়, চোয়াল কিংবা পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি হতে পারে। সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমিভাব, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে।
সহজভাবে যে লক্ষণগুলো মনে রাখবেন
হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাব্য লক্ষণ—
বুকের মাঝখানে চাপ, ভারীভাব, চেপে ধরা বা ব্যথা
ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া
শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
ঠান্ডা ঘাম
বমিভাব বা বমি
মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগা
অস্বাভাবিক ক্লান্তি
বুকের অস্বস্তি কিছুক্ষণ পর কমে গিয়ে আবার ফিরে আসা
সব হার্ট অ্যাটাকে উপসর্গ একই রকম হয় না। কিছু ক্ষেত্রে লক্ষণ তুলনামূলক মৃদু হতে পারে। এমনকি কারও ক্ষেত্রে বুকব্যথা খুব স্পষ্ট না-ও থাকতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে নারীদের উপসর্গ অনেক সময় প্রচলিত ধারণার চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। বুকের অস্বস্তির পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, বমিভাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, পিঠ বা চোয়ালে ব্যথা কিংবা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণকে অনেক সময় বদহজম, ক্লান্তি বা অন্য সাধারণ সমস্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
তাই শুধু প্রচণ্ড বুকব্যথা না থাকলেই হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
ডায়াবেটিস ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
ডায়াবেটিসসহ হৃদ্রোগের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উপসর্গ সব সময় একই ধরনের নাও হতে পারে। কখনো শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা, বমিভাব বা অস্বস্তিই গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে বয়স, শারীরিক অবস্থা বা আগের হৃদ্রোগের ইতিহাস বিবেচনায় নিয়ে বুকের নতুন বা অস্বাভাবিক অস্বস্তিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
কখন এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না?
বুকের ব্যথা বা চাপের সঙ্গে যদি শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, মাথা ঘোরা, বমিভাব, অজ্ঞান হওয়ার অনুভূতি বা শরীরের অন্য অংশে ব্যথা থাকে, তাহলে এটিকে জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে। কারণ দ্রুত চিকিৎসা শুরু হলে হৃদ্পেশির ক্ষতি কমানোর সুযোগ বাড়ে।
বুকের অস্বস্তি কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হলে, কমে গিয়ে আবার ফিরে এলে কিংবা অন্যান্য সতর্কসংকেতের সঙ্গে দেখা দিলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
‘গ্যাসের ওষুধ খেয়ে দেখি’—এই অপেক্ষা বিপজ্জনক হতে পারে
বুকব্যথা হলে নিজে থেকে অ্যান্টাসিড বা গ্যাসের ওষুধ খেয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা নিরাপদ নয়। কারণ হার্ট অ্যাটাকের কিছু উপসর্গ বদহজম বা অ্যাসিডিটির মতো মনে হতে পারে। এমনকি চিকিৎসা-পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন যে ব্যথাটি গ্যাসের কারণে হয়েছে নাকি হৃদ্রোগের কারণে।
হার্ট অ্যাটাক নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের মূল্যায়নের পাশাপাশি ইসিজি ও রক্ত পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়।
তাই বুকব্যথার কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকলেও চিকিৎসা নিতে দেরি করা উচিত নয়।
জরুরি অবস্থায় কী করবেন?
কারও হার্ট অ্যাটাকের মতো উপসর্গ দেখা দিলে প্রথম কাজ হলো দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া এবং রোগীকে একা না রাখা। রোগীকে আরামদায়ক অবস্থায় বসিয়ে বা বিশ্রামে রেখে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। জরুরি চিকিৎসাকর্মীদের মাধ্যমে হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হলে সেটিই বেশি নিরাপদ, কারণ পথে চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ থাকে।
তবে কোনো ব্যক্তিকে নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ানোর আগে তাঁর অ্যালার্জি, অন্যান্য রোগ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে হৃদ্রোগের সন্দেহে নিজে থেকে নানা ধরনের ওষুধ খেয়ে সময় নষ্ট করা উচিত নয়।
সময়ই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হৃদ্পেশিতে রক্তপ্রবাহ যত বেশি সময় বাধাগ্রস্ত থাকে, ক্ষতির আশঙ্কাও তত বাড়ে। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে হৃদ্পেশির ক্ষতি কমানোর সুযোগ থাকে।
এ কারণেই বুকের অস্বস্তিকে ‘গ্যাস’ ধরে নিয়ে অপেক্ষা করার অভ্যাস বদলানো প্রয়োজন। প্রতিটি বুকব্যথা হার্ট অ্যাটাক নয়—এটি যেমন সত্য, তেমনি প্রতিটি নতুন বা অস্বাভাবিক বুকব্যথাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার—এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
বুক জ্বালা, টক ঢেকুর বা পেটফাঁপা অনেক সময় অ্যাসিডিটি বা গ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিন্তু বুকের মাঝখানে চাপ বা চেপে ধরা অনুভূতি, ব্যথা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমিভাব কিংবা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
বুকব্যথার কারণ নিজে থেকে নির্ধারণ না করে, হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।
কারণ হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্তও কখনো কখনো জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।


0 মন্তব্যসমূহ